Thursday 30 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

শরীয়তপুরে কোটি টাকার এইচবিবি সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩০ জুলাই ২০২৬ ১২:২৫

শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের আওতায় গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের তিনটি হেরিংবোন (এইচবিবি) সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে নিম্নমানের ইট ব্যবহার, পর্যাপ্ত বালু না দেওয়া এবং নির্মাণকাজে নীতিমালা অনুসরণ না করেই কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

বুধবার (২৯ জুলাই) উপজেলার নারায়ণপুর ও চরসেনসাস ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে নির্মাণকাজে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরসেনসাস ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বদু মিয়া ঢালির বাড়ি থেকে সালেহ মুসার জমি পর্যন্ত ৬৩০ মিটার, একই ইউনিয়নের শাহজালাল হাওলাদারের বাড়ি থেকে সোলেমান ব্যাপারির বাড়ি পর্যন্ত ৩৭০ মিটার এবং নারায়ণপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে তালুকদার বাড়ি-সংলগ্ন পাকা সড়ক থেকে আব্দুর রব সরদারের জমি পর্যন্ত ৬০০ মিটার কাঁচা রাস্তা হেরিংবোন (এইচবিবি) সড়কে উন্নীত করার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। তিনটি প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ১৬ লাখ ১৯০ টাকা ৬৯ পয়সা।

প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ‘অথই এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তাদের দাবি, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) যোগসাজশে এসব অনিয়ম হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ও বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণপুর ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ি-সংলগ্ন পাকা সড়ক থেকে আব্দুর রব সরদারের জমি পর্যন্ত নির্মিত এইচবিবি সড়কের কাজ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিলও উত্তোলন করেছে। তবে সড়কটিতে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সড়কের এজিং নির্মাণেও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ইটের নিচে পর্যাপ্ত বালু ব্যবহার করা হয়নি, যে কারণে একাধিক জায়গায় ফাটল ধরেছে এবং ভেঙে পড়েছে রাস্তার অধিকাংশ এজিংও। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে চরসেনসাস ইউনিয়নের দু’টি সড়ক নির্মাণেও।

এ ছাড়াও তাদের দাবি, এইচবিবি সড়কের নিচের স্তরে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করায় সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির ইট সমানভাবে বিছিয়ে পানি দিয়ে রোলারের মাধ্যমে ড্রেসিং করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নারায়ণপুর ইউনিয়নের অটোরিকশাচালক সোহাগ ব্যাপারি বলেন, ‘আমাদের এই রাস্তাটি দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। রাস্তার কাজ শুরু হওয়ায় আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু নিম্নমানের কাজ হওয়ায় অল্পদিনের মধ্যেই এটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত।’

চরসেনসাস ইউনিয়নের বাসিন্দা করিম মিয়া বলেন, ‘গ্রামের মানুষের চলাচলের জন্য এই রাস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাজের মান নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। সঠিকভাবে তদারকি করা দরকার। এখানে ইট, বালু কোনোটাই সঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। আমি মনে করি, ঠিকাদারের পাশাপাশি কর্মকর্তারাও জড়িত এই অনিয়মে।’

পুটিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. জানে আলম বলেন, ‘শুরু থেকেই নিম্নমানের ইট ব্যবহারের বিষয়টি আমরা জানিয়েছিলাম। তখন সংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন, এগুলো পরিবর্তন করে এক নম্বর ইট দেওয়া হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। পর্যাপ্ত বালু ব্যবহার না করায় রাস্তার বিভিন্ন অংশ এরইমধ্যে দেবে গেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. রুহুল আমীন ব্যাপারি বলেন, ‘কাজের মান ঠিক রেখেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কিছু স্থানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। কাজ অফিস বুঝে নিয়েছে এবং বিলও দিয়েছে।’

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হাসান আহমেদ বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির ইটসহ সব নির্মাণসামগ্রী নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা পরিদর্শন করে বিল দিয়েছি। কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি।’

ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। আমি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব। কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জামানতের অর্থ থেকে সড়কটি পুনরায় সংস্কার করা হবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর