মানিকগঞ্জ: বর্ষা এলেই যেন থমকে যায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট। নদীর পানি বাড়লেই একের পর এক ঘাট অচল হয়ে পড়ে, ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়, আর ঘাটে পাড়ের অপেক্ষায় থাকে যানবাহন। চালকদের ক্ষোভ আর ব্যবসায়ীদের বাড়তি লোকসান যেন প্রতি বছরেরই পরিচিত চিত্র। সংশ্লিষ্টরা একে মৌসুমি সমস্যা বললেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে বছর ঘুরে একই সংকট আবারও ফিরে এসেছে।
সরেজমিনে পাটুরিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ৫ নম্বর ফেরিঘাট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি নদীর তীব্র স্রোত ও পানি বৃদ্ধির কারণে মাঝেমধ্যেই বন্ধ রাখতে হচ্ছে ৪ নম্বর ঘাটের কার্যক্রমও। ফলে সচল ঘাটগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফেরিতে যানবাহন ওঠানো-নামানোর গতি কমে যাওয়ায় ঘাট এলাকায় তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি। ট্রাক, বাস, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনকে পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
শুধু ফেরিঘাট নয়, নদীভাঙনের কারণে স্থানান্তর করা লঞ্চঘাটেও বিরাজ করছে নাজুক পরিস্থিতি। অস্থায়ী ও নিচু সংযোগ সড়ক নদীর পানি বাড়লেই তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে যাত্রীদের পানি ও কাদার মধ্য দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে উঠতে হচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, নিরাপদ হাঁটার পথ কিংবা ব্যবহারযোগ্য টয়লেট। নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
ঘাটে আটকে থাকা ট্রাকচালক সোহেল মিয়া বলেন, ‘একটি গাড়ি ফেরিতে তুলতেই অনেক সময় লাগছে। সচল ঘাট কম থাকায় সিরিয়াল এগোয় না। কখন পার হতে পারব, সেটাও বলতে পারছি না।’
বাসচালক মতিয়ার হোসেন বলেন, ‘ঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছেন। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে যাত্রী ও পরিবহন মালিক, উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
যাত্রী পারুল বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে বসে থাকার মতো জায়গা নেই। টয়লেটেরও ভালো ব্যবস্থা নেই। বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগ। অথচ কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যায় না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও ঘাট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন ও পানির উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে বর্ষা এলেই নৌরুটের সক্ষমতা কমে যায় এবং পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম বলেন, ‘নদীতে স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। কয়েকটি ঘাট বন্ধ থাকায় সচল ঘাটগুলোতে অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাজ চলছে।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রবিউল আলম বলেন, ‘বর্ষাকালে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ঘাট বারবার স্থানান্তর বা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হচ্ছে। সংযোগ সড়ক যাতে তলিয়ে না যায়, সে জন্য জিও ব্যাগ ফেলে রাস্তা উঁচু করার কাজ চলছে। যাত্রীসুবিধা বাড়াতেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯টি ফেরি এবং ৩২টি লঞ্চ চলাচল করছে। প্রতিদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার যানবাহন এবং বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই নৌপথ ব্যবহার করেন। ফলে ঘাটের সক্ষমতা কমে গেলে তার প্রভাব শুধু যাত্রী ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, ব্যাহত হয় পণ্য পরিবহন, বাড়ে পরিবহন ব্যয় এবং চাপ পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে আগাম পরিকল্পনা ও স্থায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। নদীর আচরণ বিবেচনায় আধুনিক ও অভিযোজনযোগ্য ঘাট, উঁচু সংযোগ সড়ক, নিরাপদ যাত্রীসেবা এবং কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে বর্ষার দুর্ভোগ আগামী বছরগুলোতেও একইভাবে ফিরে আসবে।