Sunday 02 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সিরাজগঞ্জে আবারও জেগে উঠেছে পাটের স্বর্ণযুগ

আশরাফুল ইসলাম জয়
২ আগস্ট ২০২৬ ১৪:৩৬ | আপডেট: ২ আগস্ট ২০২৬ ১৪:৩৯

পাটের আঁশ ছাড়িয়ে গুদামজাত করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ: এক সময় দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই ফসলই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু কৃত্রিম তন্তুর ব্যাপক ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা ধীরে ধীরে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। সিরাজগঞ্জেও একই চিত্র দেখা যায়। জেলার অনেক এলাকায় বছরের পর বছর পাটের আবাদ কমতে কমতে এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে, কিছু অঞ্চলে প্রায় তিন দশক ধরে পাটের চাষই বন্ধ ছিল।

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আবারও বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি, বাজারে সন্তোষজনক দাম এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকির ফলে সিরাজগঞ্জে পাট আবারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কৃষকের মুখে ফিরেছে হাসি, মাঠজুড়ে দুলছে সবুজ পাটখেত, আর গ্রামবাংলার খাল-বিলে ফিরে এসেছে পাট জাগ দেওয়ার চিরচেনা দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

এ বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাটের ফলন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। বিশেষ করে শাহজাদপুর ও চলনবিল অঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর পর পুনরায় পাট চাষ শুরু হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে চাষ করা কৃষকেরা প্রথম মৌসুমেই পেয়েছেন আশাতীত ফলন ও লাভ।

কামারখন্দ উপজেলার পাইকোশা গ্রামের কৃষক মাহিদুল ইসলাম জানান, একসময় পাটের দাম না থাকায় তারা চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে কৃষি বিভাগের উৎসাহে আবার পাট আবাদ করেন।

তিনি বলেন, আমরা ভাবতেই পারিনি এত ভালো ফলন হবে। প্রতিটি গাছ ১২ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। বিঘাপ্রতি প্রায় ১৫ মণ পাট পেয়েছি। বাজারেও ভালো দাম থাকায় খরচ তুলে লাভ করতে পারছি।

শুধু পাইকোশা নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। এবার উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে পাট চাষের পরিকল্পনা করছেন তারা।

বর্তমানে জেলার হাট-বাজারগুলোতে নতুন পাটের বেচাকেনা জমে উঠেছে। বাজারে মেস্তা পাট প্রতি মণ ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে তোষা পাটের দাম প্রতি মণ ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় এই মূল্য কৃষকদের জন্য যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী এলাকার পাট ব্যবসায়ী রহমত আলী জানান, এ বছর পাটের মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা সরাসরি এসে পাট কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এবং কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।

বর্ষা মৌসুমের এই সময়ে জেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন পুরোদমে চলছে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, ধোয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ। খাল-বিল, নদী ও বন্যার পানিতে সারি সারি করে জাগ দেওয়া পাট যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে আবারও ফিরিয়ে এনেছে। গ্রামের পথঘাটে শুকাতে দেওয়া পাটের আঁশ আর পাটের শোলার পরিচিত গন্ধ নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাংলার সেই সোনালি দিনের কথা।

পাট চাষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষেরও কর্মসংস্থান বেড়েছে। পাট কাটা, বহন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও বাজারজাতকরণ প্রতিটি ধাপেই বাড়তি শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে গ্রামীণ এলাকায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে ১৪ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দেশি, তোষা, মেস্তা, কেনাফ, জেআরও-৫২৪, সবুজ সোনা এবং বারি-১ জাতের পাট উল্লেখযোগ্য। গড়ে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণ উৎপাদন হলেও কয়েকটি এলাকায় ১৫ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া গেছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাজারদর ভালো থাকায় অধিকাংশ কৃষক সন্তোষজনক মুনাফা অর্জন করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। শপিং ব্যাগ, জিও-টেক্সটাইল, কার্পেট, হস্তশিল্প, আসবাবের উপকরণ, ফ্যাশন সামগ্রী ও শিল্পকারখানায় পাটের বহুমুখী ব্যবহার নতুন বাজার তৈরি করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও পাটের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষকদের ওপর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের কারণে এ বছর পাটের ফলন খুবই ভালো হয়েছে।
তিনি জানান, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং বাজারমূল্য ভালো থাকায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ভবিষ্যতেও পাট চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাবে।

একসময় যে পাটখেত হারিয়ে যেতে বসেছিল, আজ সেই জমিতেই আবার দুলছে সবুজের সমারোহ। কৃষকের ঘরে ফিরছে লাভ, গ্রামীণ অর্থনীতিতে আসছে গতি, আর ‘সোনালি আঁশ’ আবারও নিজের হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি বাজারদর স্থিতিশীল থাকে, উন্নত বীজ ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় এবং পাটজাত শিল্প আরও সম্প্রসারিত হয়, তাহলে সিরাজগঞ্জ শুধু নয়, দেশের অর্থনীতিতেও পাট আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

 

সারাবাংলা/এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

আশরাফুল ইসলাম জয় - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর