Sunday 30 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বড়লেখায় গৃহবধূ মুন্নির রহস্যজনক মৃত্যু, পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩০ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪০ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪৬

নিহতের পরিবারের সংবাদ সম্মেলন।

সিলেট: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ৫ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে এক সন্তানের জননী মরিয়ম আক্তার মুন্নিকে (২২) নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যার পর মরদেহ বাথরুমের কাঠের বিমের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরিয়ে দিতে প্রভাবশালী একটি চক্র পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বলেও অভিযোগ করেছে নিহতের স্বজনেরা। এ ঘটনায় থানায় গিয়েও এখনো হত্যা মামলা দায়ের করতে না পেরে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ সংক্রান্ত নৃশংসতার রোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরেন নিহতের স্বজনেরা। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নিহতের বাবা হাজী মকবুল আলী ও মা রেনু বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মুন্নির খালাতো ভাই মাছুম আহমদ। সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত মূল অভিযোগ ও ঘটনার পেছনের বিবরণে উঠে এসেছে নানা তথ্য-

বিজ্ঞাপন

যৌতুকের অন্যায্য দাবি ও নির্মম নির্যাতন

২০২৩ সালে বড়লেখা উপজেলার মুড়িরগুল গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী মামুনুর রশিদ লাভলুর সঙ্গে পারিবারিকভাবে মুন্নির বিয়ে হয়। বর্তমানে তাদের কোলজুড়ে এক বছরের একটি সন্তান রয়েছে। পরিবারের দাবি, বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ি, ননদ, ভাসুর ও জা মিলে মুন্নির ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। সম্প্রতি বিদেশে স্বামীর জন্য গাড়ি কেনার অজুহাতে মুন্নির পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। মেয়ের সংসারের সুখের কথা চিন্তা করে বাবা-মা একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ওই টাকা এনে দিলেও নির্যাতন থামেনি, বরং ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য নতুন করে আবার টাকা এনে দিতে তার ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।

মৃত্যুর ঠিক আগের আলামত ও ভিডিও বার্তা

গত ২১ আগস্ট শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে মুন্নির তীব্র বিরোধ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে অসহায় মুন্নি নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে ভিডিও ও খুদে বার্তার (SMS) মাধ্যমে বাবা-মাকে জানান, ননদ, ভাসুর, জা ও শাশুড়ি মিলে তাকে যেকোনো মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারেন। খবর পেয়ে মুন্নির বাবা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধানের আকুতি জানান। এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি ফোন করে মুন্নির বাবাকে দ্রুত শ্বশুরবাড়িতে আসতে বলেন। সেখানে গিয়ে বাথরুমের দরজার ওপর কাঠের বিমের সঙ্গে মুন্নির ঝুলে থাকা নিথর দেহ দেখতে পান স্বজনেরা।

পরিকল্পিত হত্যা ও আলামত গায়েব

পরিবারের সরাসরি দাবি, মৃত্যুর ঠিক কয়েক মিনিট আগেও মুন্নি তার নির্যাতনের কথা ফোনে জানিয়েছিলেন। ফলে হুট করে তার আত্মহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণ সাজানো ও সন্দেহজনক। মরদেহ নামানোর পর মুন্নির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়, যা ছবি ও ভিডিও আলামত হিসেবে নিহতের পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তাছাড়া, মুন্নির ব্যবহৃত আসল মোবাইল ফোনটি এখনো রহস্যজনকভাবে গায়েব রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের মতে, ওই ফোনে নির্যাতনের ভিডিও, অডিও ও চ্যাট হিস্ট্রি রয়েছে, যা ফরেনসিক পরীক্ষা করলেই স্পষ্ট হবে এটি আত্মহত্যা নাকি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য ও আইনি জটিলতা

সংবাদ সম্মেলনে নিহতের মা-বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, মরদেহ উদ্ধারের পরপরই একদল স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ময়নাতদন্ত না করিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য থানায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু পরিবারের অনড় অবস্থানের কারণে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও পুলিশ এখনো নিহতের বাবার দেওয়া হত্যা মামলা নিচ্ছে না। একই সঙ্গে আসামিপক্ষ থেকে পরিবারটিকে প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে নিহতের অসহায় পরিবার ডিজিটাল আলামত সংরক্ষণ, গায়েব হওয়া মোবাইল উদ্ধার, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা মুন্নীর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন। এ ঘটনার নিন্দা-প্রতিবাদে ফেসবুকে রীতিমতো ঝড় উঠেছে। এবং হত্যাকাণ্ড হিসেবে মামলা না নেওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন। তারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

যা বলছে পুলিশ

অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের পর একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা রুজু করা হয়েছে। মরদেহের প্রাথমিক লক্ষণ দেখে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এরইমধ্যেই ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে এবং সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (২১ আগষ্ট) সন্ধায় বড়লেখা পৌরসভার ০৫ নং ওয়ার্ডের মুড়িরগুল গ্রামে সৌদি প্রবাসী মামুনুর রশীদ লাভলুর বাড়ি থেকে মুন্নীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর