রাজবাড়ী: শহরের বড় বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানার বিরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশের সামনে তাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাজবাড়ী জেলাসহ দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে রাজবাড়ী শহরের কাপড় বাজারে এ ঘটনা ঘটে। রোববার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাজবাড়ী সদর থানা-পুলিশের উপস্থিতিতে ওই নারীকে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে এক যুবক এসে তাকে লাথি মারেন। পরে আরও কয়েকজন যুবক এগিয়ে এসে তাকে লাথি মারতে থাকেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাকিয়া সুলতানার ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ প্রতিষ্ঠানে শাহানা পারভীন বৃষ্টি নামে এক নারী সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কর্মরত অবস্থায় জাকিয়া সুলতানার সঙ্গে বৃষ্টির বিরোধ সৃষ্টি হলে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। পরে একই কাপড় বাজারে নিজেই একটি দোকান দেন বৃষ্টি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে একই বাজারে নিজস্ব দোকান দেওয়ার বিষয়টি জাকিয়া সুলতানা মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে তিনি কাপড় বাজার কমিটির সভাপতি আজিজ মন্ডলের কাছে বৃষ্টির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। তবে আজিজ মন্ডল এতে সম্মতি না দেওয়ায় জাকিয়া সুলতানার সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এক পর্যায়ে আশপাশের কয়েকজন ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানাকে ধাক্কা দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেন বলে জানা গেছে। পরে ওই ঘটনাকে হামলা ও হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানান জাকিয়া সুলতানা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।
প্রতিবাদ সমাবেশে জাকিয়া সুলতানা কাদেরিয়া মার্কেটে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। এ সময় মার্কেটের দোকান মালিক ও কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে কাপড় বাজারের ব্যবসায়ীরা তাকে ধাওয়া করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জাকিয়া সুলতানাকে নিরাপদে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর থানায় নিয়ে যায়। ঘটনার পর কাদেরিয়া মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে জাকিয়া সুলতানাকে গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় যান। পরে তারা জাকিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেন।
কাপড় বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, জাকিয়া সুলতানা বাজারে দোকান নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। তারা আরও অভিযোগ করেন, তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, শাহানা পারভীন বৃষ্টিকেও জাকিয়া সুলতানা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন। এসব কারণে বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করেন বলে তারা জানান। এর পর থেকেই বৃষ্টির দোকান বন্ধের জন্য জাকিয়া সুলতানা বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘সম্প্রতি আমার দোকানের কর্মচারী বৃষ্টি আমাকে হিসাব বুঝিয়ে না দিয়ে অন্য দোকানে চলে যায়। বিষয়টি নিয়ে আমি রাজবাড়ী কাপড় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কাছে অভিযোগ করি। কিন্তু তারা আমার অভিযোগ আমলে না নিয়ে উলটো আমাকে লাঞ্ছিত ও মারধর করে বাজার থেকে বের করে দিয়েছে।’
রাজবাড়ী বাজার কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক কাজী বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘ওই নারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। উনি কয়েকশ’ লোক নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাকর্মীদের নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালি দেয় ও ব্যবসায়ীদের ওপর চড়াও হয়। ওই নারীর বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। নানাভাবে ওই নারী ব্যবসায়ীদের জ্বালাতন করতেন। ওই নারীর দোকানের এক কর্মচারী দোকান দেবে। কিন্তু তাকে দোকান দিতে দেবে না। এখান থেকেই ঝামেলার শুরু।’
রাজবাড়ী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, ‘ব্যবসাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বাজারের ব্যবসায়ীরা জাকিয়া সুলতানাকে ঘিরে ধরেছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরে দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি সমাধান হয়েছে।’