রংপুর: নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার রহস্য যত গভীরে যাচ্ছে, ততই নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে তদন্তে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টায় মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, গ্রেফতার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ৮০ ঘণ্টায় ৮০ বার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে একবার এই যোগাযোগ অস্বাভাবিক বলে মনে করছে পুলিশ, যা ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পুলিশের এই নতুন তথ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় ডোপ টেস্টের ফলাফল। গত রোববার (৩০ আগস্ট) রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দুই আসামির প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করা হয়, যাতে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অথচ আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিতে হত্যার আগে ও পরে ৮-৯টি ইয়াবা সেবনের কথা জানিয়েছিল। ডোপ টেস্টের এই নেতিবাচক ফল তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর (গ্রেফতারের ৮ দিন পর) নমুনা নেওয়ায় এই ফল পাওয়া স্বাভাবিক। মেথঅ্যামফিটামিন প্রস্রাবে সাধারণত ২-৪ দিন, নিয়মিত সেবনকারীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ দিন পর্যন্ত শনাক্তযোগ্য থাকে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রস্রাবে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন থাকে। এর পরে আর পাওয়া যায় না। যেহেতু এরা সাত দিনের বেশি সময় ধরে আটক অবস্থায় আছে, বিধায় এই টেস্টটি নেগেটিভ এসেছে।’
ঘটনার অন্য দিকে, পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বিপরীতে আদালত আসামিদের দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মামলার তদন্তভার ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ডিবি পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, মুগ্ধের বাবা কানু দাস সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাসের ফুফাতো ভাই, ফলে তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই।
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। নিহতের ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু নিহতের বাড়ি পরিদর্শন করে দ্রুত অভিযোগপত্র ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। তবে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে বিচারিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।