Saturday 29 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

দেদারছে চলছে ছিনতাই / অপ্রতিরোধ্য ছিনতাইকারী, টাকা-গয়নার সঙ্গে যাচ্ছে জীবনও

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৯ আগস্ট ২০২৬ ২০:১১

ছিনতাই। প্রতীকী ছবি

ঢাকা: রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দিন দিন যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে ছিনতাইকারীরা। কি সকাল, কি দুপুর- এমনকি সন্ধ্যা, কিংবা রাত- কোনো সময়েই থেমে নেই ছিনতাই। ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাত, গুলি কিংবা হেঁচকা টানে আহত হয়ে হাসপাতালে জীবন মৃত্যুর পাঞ্জা লড়ছেন অনেকেই। ছিনতাইকারীর আঘাতে অনেকে নিহতও হচ্ছেন। ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু রাজধানীতেই ছিনতাই হচ্ছে- এমনটা নয়। বরং, সারাদেশেই ছিনতাই চলছে দেদারছে। এতে সাধারণ মানুষ একেবারে নিরুপায় হয়ে পড়েছে।

শুধুমাত্র শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১০টি। এর মধ্যে দু’টি ছিনতায়ের ঘটনায় (আগারগাঁও ও কদমতলী) দু’জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে একজন স্কুল শিক্ষিকা ও অন্যজন ছিনতাইকারী।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোর ৬টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলানগর এলাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের রাস্তায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রিকশায় থাকা আরোহী রনজিনা পারভীনের (৫৫) ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে হেঁচকা টান দেয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন। এতে তিনি মাথার পেছনে প্রচণ্ড আঘাত পান। পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত্যু হয়। রনজিনা পারভীন বগুড়ায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।

শেরেবাংলা নগর থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল হাসান রিয়াদ বলেন, ‘নিহত রনজিনা পারভীনের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে। তিনি বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।’

‎এসআই আরও বলেন, ‘‎রাতে বগুড়া থেকে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে রাজধানীর ফার্মগেটে ইসলামিয়া চক্ষু হাসাপাতালে চিকিৎসক দেখাতে আসছিলেন। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনাল নামেন তারা। এর পর ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আসা মাত্রই পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী ওই শিক্ষিকার ব্যাগ ধরে হেঁচকা টান দেয়। এতে তিনি পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। এর পর ওই শিক্ষিকার স্বামী তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

এদিকে শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন নামা শ্যামপুর বড়ইতলা এলাকায় এক ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জনি (৩৫) নামে আরেক ছিনতাইকারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) মো. জিন্নাত আলী বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কদমতলীর নামা শ্যামপুর বরইতলা এলাকায় এক যুবককে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাত ৪টার দিকে নামা শ্যামপুর বরইতলায় দুই ছিনতাইকারীর দ্বন্দ্বে ছুরিকাঘাতে জনি নামের ওই যুবক নিহত হন।’

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্ন্ত চার মাসে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৭৮০টি। আর গত দুই মাসের তথ্য এখনো প্রকাশ না করলেও পুলিশের ঊর্ধতন এক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে শনিবার বলেন, ‘গত দুই (জুলাই ও আগস্ট) মাসে ছিনতাই হয়েছে অন্তত ৫০০ মতো।’ তার মানে এটি সত্য হলে গত ৬ মাসে মোট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৮০টির মতো। এর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য বলছে, সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও, উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, ওয়ারী, মোহাম্মদপুর এবং মতিঝিল এলাকায় ছিনতাই বেশি ঘটছে। ছিনতাইকারীরা মূলত রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বেশি সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভোরে বাসে আসা যাত্রীরা বাসস্ট্যান্ডে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পথে বেশি ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাত ১০টার পর থেকে সকাল পর্যন্ত সড়কে পুলিশের দেখা মিলছে না। টহল পুলিশের গাড়িও চোখে পড়ছে না। ফলে ছিনতাইকারী একরকম অপ্রতিরোধ্য অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা সুযোগ বুঝে দেদারছে ছিনতাই চালিয়ে যাচ্ছে। আবার দুয়েকজন ধরা পড়লেও ক’দিন পরেই জামিনে বেরিয়ে আসছে। এর পর তারা ফের একই কাজ করছে।

ছিনতাইয়ের সময় নিহত রনজিনা পারভীনের স্বামী আব্দুল মতিন বলেন, ‘গাবতলী থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত পুরো সড়কে কোনো পুলিশ চোখে পড়েনি। এমনকি পুলিশের কোনো গাড়িও দেখিনি। এমন অবস্থায় ছিনতাইকারীরা তো সুযোগ নেবেই। ঘটনা ঘটার পর পুলিশ এসে হাজির। এমন হলে তো চলবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন কোনো হরতাল, মিছিল মিটিং নেই। তাহলে পুলিশ সদস্যরা সড়কে না থেকে ‍ঘুমাচ্ছেন কেন? পুলিশের কাজ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। অথচ পুলিশ ঘুমাচ্ছে আর রাস্তায় মানুষ মারছে ছিনতাইকারীরা।’

উত্তরায় গত কয়েকদিনে অন্তত ১০টির মতো ছিনতাই হয়েছে। দক্ষিণ খান থানায় ছিনতাইয়ের শিকার আব্দুল মোমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত বুধবার (২৬ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে ছিনতাইয়ের সময় ফোন ছাড়তে চাইনি, তাই হাতেই ছুরিকাঘাত করে ফোনটা নিয়ে চলে যায়। থানায় মামলা করেও কোনো লাভ হয়নি। এখনো শনাক্ত হয়নি ছিনতাইকারী। থানায় গিয়ে দেখি, ছিনতাইয়ের শিকার আরও অনেকেই প্রতিকারে জন্য হাজির হয়েছেন।’

পল্লবী এলাকাতে গত কয়েকদিনে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন অন্তত ৫০ জন ব্যক্তি। যার বেশিরভাগই পল্লবী থানায় মামলা ও জিডি করেছেন। এদের মধ্যে একজন মিনহাজ হাফিজ। যিনি ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে সাগুফতা এলাকায়। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ছিনতাইকারীরা ফোন, টাকা, মানিব্যাগ- সব নিয়ে গেছে। দেশীয় অস্ত্র ধরেছিল গলায়। ভয়ে সব দিয়ে দিছি। থানায় অভিযোগ দিলাম। কিন্তু ছিতাইকারীদের গ্রেফতার করতে পারছে না পুলিশ।’

ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছিনতাই হচ্ছে অস্বীকার করার উপায় নাই। কিন্তু ছিনতাইকারীদের গ্রেফতারেও এগিয়ে রয়েছে ডিএমপি। যা কিছুই হচ্ছে তার সবকিছুই শনাক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে আসামিও গ্রেফতার হচ্ছে। আমরা আদালতে পাঠাচ্ছি। আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে ফের ছিনতাইয়ে সক্রিয় হচ্ছে- এমন অভিযোগও পাচ্ছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবাইকে সচেতন হতে হবে। একইসঙ্গে পুলিশকেও সজাগ থাকতে হবে। ছিনতাই বর্তমানে সামাজিক ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। এই ছিনতাই রুখে দিতে হলে পুলিশ ও জনগণ উভয়কে একসঙ্গে লড়তে হবে। অনেকের সামনেই ছিনতাই হচ্ছে, অথচ দাঁড়িয়ে দেখছে। এসব করা যাবে না। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ছিনতাইকারীকে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ডিসি মিডিয়া বলেন, ‘পুলিশ সব জায়গায় টহলে থাকে। এরপরেও অনেক জায়গা বাদ পড়ে যায়। ঠিক তখনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পুরো নগরজুড়ে নষ্ট সিসিটিভি মেরামতের কাজ শেষের দিকে। সেই সঙ্গে জনবল বাড়ানোর কাজও চলছে।’

ডিএমপির তথ্য বলছে, চলতি মাসে প্রায় ৫০০-৬০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই আগে গ্রেফতার হয়ে জেলে ছিলেন। তারা জামিনের বেরিয়ে ফের একই কাজ করছেন।

এ বিষযে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ সারাবাংলাকে বলেন, ‘পেশাদার ছিনতাইকারীদের জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ সক্রিয়তার অভাব অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পথে-মাঠে-ঘাটে সক্রিয় ভুমিকা পালন করাই মূল কাজ। না হলে ছিনতাই অপ্রতিরোধ্যই থেকে যাবে।’ এতে প্রাণহানি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তার।

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর