Saturday 01 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

পুলিশ কি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারছে?

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১ আগস্ট ২০২৬ ১১:২০ | আপডেট: ১ আগস্ট ২০২৬ ১৩:২৭

কোলাজ ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজিরবিহীনভাবে ভেঙ্গে পড়ে। থানাগুলো শূন্য হয়ে যায়। পালিয়ে যায় বেশিরভাগ পুলিশ। কেউ অপরাধের দায় নিয়ে আবার কেউ ভয়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। যে কারনেই হোক পুলিশ শূন্য হয়ে পড়ে গোটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জরুরি প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সেনাবাহিনী ও গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নতি হচ্ছিল না। তবে উপদেষ্টারা, সারাদেশের শিক্ষার্থীরা ও বুদ্ধিজীবীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটে। গণহত্যার সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের ধীরে ধীরে সরিয়ে সেখানে ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তাদের পদায়ন করায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। তবে প্রতিদিনের একাধিক দাবি আদায়ের আন্দোলন আর বিভিন্ন সংস্কার গোষ্ঠীর চাপের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন থমকে থাকে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে ভোট হয়ে গেলে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই সংকট কেটে যাবে।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে যথারীতি জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেলো। দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠন করলো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকে প্রধান প্রায়োরিটি সেট করা হলো। ঢেলে সাজানো হলো পুলিশ বাহিনীকে। এখনো তা চলমান রয়েছে। নতুন সরকারের ৬ মাসে এসে হিসেব করার সময় হয়েছে আদৌ কি পুলিশ বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে?

আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ পুলিশ এখনো পুরোপুরি বা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, তবে মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যক্রম ও দাফতরিক উপস্থিতি অনেকটাই সক্রিয় হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বাহিনীর ইমেজ সংকট কাটিয়ে উঠতে পুলিশ নানা সংস্কার ও চেষ্টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুড়ে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোর বেশিরভাগই সংস্কার করা হয়েছে এবং নতুন যানবাহন যুক্ত করে দাফতরিক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর পুলিশের ভেতরে যে আস্থার ঘাটতি ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটেনি। মাঠপর্যায়ে মব জাস্টিস বা বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় তাদের যথেষ্ট দৃঢ় ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। পুলিশ নিয়মিত টহল, মামলা গ্রহণ এবং কিছু ক্ষেত্রে বড় জমায়েত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কাজ চালিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের মনে পুরোপুরি আস্থার জায়গা এখনো তৈরি করতে পারেনি।

তবে পুলিশ সদর দফতরের দাবি, যে অবস্থায় পৌঁছেছিল সেই তুলনায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বরং সাফল্যের হার আগের বেশিই দেখা গেছে। কোনো একটি ঘটনার পর তা শনাক্ত করা এবং আসামিকে গ্রেফতার করা অনেক এগিয়েছে। ঘটনার ঘটার পর তা শনাক্ত হয়নি বা আসামি গ্রেফতার হয়নি সেই সংখ্যা প্রায় শুন্যের কোটায় এসেছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে খুনের মামলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে সারাদেশে ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। অপরাধ বিশ্লেষকের দাবি, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বাড়ায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে হত্যা মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৫টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের তুলনায় হত্যা মামলা বেড়েছে ১৯৩টি।

চলতি বছর প্রথমার্ধে ঢাকা বিভাগে ৪১১টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। দেশের এ দুই বিভাগেই হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে রাজশাহী বিভাগে ১৮৩টি এবং খুলনা বিভাগে ১৭৩টি। তুলনামূলকভাবে কম হত্যা মামলা হয়েছে রংপুরে ১১০টি, সিলেটে ১০৮টি, ময়মনসিংহে ১০৫টি এবং বরিশাল বিভাগে ৯৬টি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, খুনের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়া জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। তবে চলতি বছর ডাকাতি ও পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা কমেছে, যাকে ইতিবাচক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে শুধু মামলার সংখ্যা নয়, অপরাধের ধরন, সংঘটনের কারণ এবং বিচারিক অগ্রগতিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আধিপত্য বিস্তার প্রবণতার কারণে খুনের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন গোষ্ঠী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এ প্রতিযোগিতায় খুনসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধ বাড়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এসব এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধও বেশি ঘটে। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না গেলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। তাই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অনেক সহিংস ঘটনার পেছনে আধিপত্যের লড়াই, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি দ্বন্দ্বের প্রভাব রয়েছে। এখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর পুরোপুরি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অনেকের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা বেড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে।’

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। খুনের ঘটনা বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অপরাধমূলক বিরোধের কারণে কমবেশি হয়ে থাকে। খুনসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।’

সারাবাংলা/ইউজে/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর