ঢাকা: মহাসড়কে র্যান্ডম চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি বা চালকদের হয়রানি বন্ধ হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য বা সংকেত পাওয়া গেলেই কেবল সমন্বিতভাবে অভিযান ও তল্লাশি চালাবে হাইওয়ে পুলিশ। মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং যানজট নিরসনেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার, যানজট শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক টোল আদায়, চালকদের বিশ্রামাগার এবং আধুনিক রেকার ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও কাজ চলছে। তবে হাইওয়ে পুলিশের সেবার ক্ষেত্রে মানবিকতা ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ঘাটতি রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন হাইওয়ে পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদ।
সম্প্রতি সারাবাংলার প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে কথা বলেন তিনি। এছাড়া সড়কের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। নিম্নে তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-
সারাবাংলা: মহাসড়কে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকর হয়েছে?
হাইওয়ে পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদ: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআইভিত্তিক ‘অটো ফাইন’ ব্যবস্থা চালু হয়েছে কয়েক দিন হলো। সেখানে ১ হাজার ৪২৭টির বেশি এআই সক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এতে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ এখন আইন মেনে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছে। তবে নিয়ম না মানার কারণে প্রতিদিন গড়ে ৩৬টি এআই মামলা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি এক মাস পর্যবেক্ষণ করব। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মহাসড়কেও এ ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করব।
সারাবাংলা: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশাপাশি অন্য মহাসড়কগুলোতেও কি ‘এআই ব্যবস্থা’ চালু হবে?
ফারুক আহমেদ: মাওয়া এলাকায় ক্যামেরা বসানো আছে। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হবে। আশা করছি, এক মাসের মধ্যে ওই সড়কেও এআই ব্যবস্থা চালু হবে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে রংপুর হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত একটি রোড সেফটি প্রকল্পের সমীক্ষা শেষ হয়েছে। টেন্ডার দেওয়া হবে। বগুড়া-রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক নিয়েও সমীক্ষা চলছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রকল্প সারা দেশের মহাসড়কে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সারাবাংলা: উৎসবের দিনগুলোতে মহাসড়কের টোল প্লাজায় যানজট কমাতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ও ক্যাশলেস হাইওয়ে ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হবে কী?
ফারুক আহমেদ: ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ও ক্যাশলেস হাইওয়ে চালু করা গেলে যানজট অনেকটাই কমে আসবে। এ নিয়ে কাজ চলছে। এই ব্যবস্থা করতে পারলে খুবই ভালো হয়। এতে কিছু জটিলতা রয়েছে, তবে ক্যাশলেস ব্যবস্থা দ্রুত চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সারাবাংলা: হাইওয়েতে চাঁদাবাজি ও চেকপোস্টের নামে হয়রানি বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
ফারুক আহমেদ: হাইওয়েতে চাঁদাবাজি ঠেকাতে আমি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিচ্ছি। সেটা পুলিশের পক্ষ থেকেই হোক অথবা শ্রমিক বা মালিক সংগঠনের। এটাকে চাঁদাবাজিও বলতে চাই না, কারণ ওরা ওয়েলফেয়ারের জন্য কিছু টাকা নেয়। তো সেটাও আমরা বলছি যে এটা টার্মিনালের বাইরে হবে না। এই যে ওয়েলফেয়ার ফান্ড বা যে ফান্ডই হোক, কল্যাণের ফান্ডই হোক আর যে ফান্ডই হোক, এটার কোনো টাকা রাস্তার বাইরে নেওয়া যাবে না। আর পুলিশ তো নিবেই না। পুলিশ গাড়ি দাঁড় করাতেই পারবে না, কোনো চেকপোস্ট করা যাবে না। মানুষ হাইওয়েতে গাড়ি নিয়ে আসে নিরাপদে এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে। তাহলে এখানে রেনডম চেকপয়েন্ট আমরা করব না। আমরা করব, যদি স্পেসিফিক ইনফরমেশন পাই, গাড়ির স্পেসিফিক ইনফরমেশন আছে, তাহলে আমরা সমন্বিতভাবে সেটাকে সার্চ করব। কিন্তু নরমাল ওয়েতে র্যান্ডমলি হয়রানি তৈরি করে এমনটা করা যাবে না। মানুষ নিরাপদে ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মহাসড়ক ব্যবহার করে। তাই র্যান্ডমভাবে হয়রানি করা যাবে না। তবে কোনো গাড়ি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা সংকেত পাওয়া গেলে সমন্বিতভাবে সেটি তল্লাশি করা হবে।
সারাবাংলা: চালকদের ডোপ টেস্ট ও বিশ্রামাগারের অগ্রগতি কতদূর?
ফারুক আহমেদ: কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমি তো দায়িত্বে এসেছি বেশি দিন হয়নি, যতটুক জানি- কুমিল্লার নিমতলীর পাশে তাদের বিশ্রামের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ঐরকম ইউজেবল হয়নি, কিন্তু এটা কার্যক্রম চলমান আছে। হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে হবে, বেশি সময় লাগবে না। আমাদের দেশে তো আমরা অনেক কার্যক্রমই নিই। কিন্তু একদম শেষ পর্যন্ত সেটা আমরা যদি ফাংশনিং যদি করতে পারি, সেটা হলো এচিভমেন্ট। একটা জিনিস করলাম, দেখা গেল যাত্রীছাউনি করছি, যাত্রীছাউনিতে যাত্রীরা বসে না, কুকুর ঘুমায়। তো ঐরকম যদি আপনি মনে করেন যে বিশ্রামাগার বানালাম, দেখা গেল বিশ্রামাগার পড়ে আছে, ঐখানে ট্রাক এসে ঢোকে না। বিশ্রামাগার একপাশে, ট্রাক রাস্তার মধ্যে থাকে, এটা আনফরচুনেট। এজন্য একটা জিনিস তৈরি হওয়ার পরে সেটাকে আমরা যে উদ্দেশ্যে তৈরি করছি সেটা ফাংশনিং না হওয়া পর্যন্ত তো এটাকে আসলে সফল বলা যাবে না। তো ঐটা হওয়ার পর তারপর বোঝা যাবে যে একচুয়ালি ড্রাইভাররা এটা ইউজ করতেছে কি না।
সারাবাংলা: দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও দুর্ঘটনাকবলিত যান সরাতে হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা কতটুকু?
ফারুক আহমেদ: দুর্ঘটনার পর দ্রুত যান সরানোর চেষ্টা করা হয়। আর অনেক সময় দেখা যায় দুর্ঘটনার কারণে রাস্তা ব্লক হয়ে যায়। তখন গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়ে সরায়। আর যদি আশেপাশে ঐরকম রিমুভ করার মতো সামর্থ না থাকে… যেমন- অনেক সময় দেখা যায় অনেক বেশি হ্যাভি ট্রান্সপোর্টের ঝামেলা হয়েছে। তো ঐটা রিমুভ করার জন্য শক্তিশালী র্যাকার যদি না থাকে, তখন ঝামেলা তৈরি হয়। সেসময়ে এই পরিস্থিতির কারণেও টাইমলি রেসপন্স বা… এটা আমাদের লিমিটেশন। এটা আসলে আমাদের ব্যবস্থাপনা প্লাস হলো সম্পত্তির লিমিটেশন। এটার কারণে অনেক ক্ষেত্রে হয়। তাছাড়া নরমালি ট্রাই করা হয় যে টাইমলি রিলিজ করার। আর তাছাড়া আমাদের দেশের লোক এগুলোর ক্ষেত্রে আবার কন্ট্রিবিউট করে। মানে একটা এক্সিডেন্ট ঘটলে সাথে সাথে আশেপাশের পাবলিকই কিন্তু এই হেল্পগুলো করে। পুলিশ না যাওয়ার আগেও কিন্তু দেখা যায় নিকটবর্তী কোনো জায়গায় গাড়িতে করে পাঠিয়ে দেয়। আমি মনে করি এই ব্যাপারে আবার আমাদের লোকজন এবং পাবলিকের হেল্পের রেসপন্স খুব ভালো। কিন্তু কিছু লিমিটেশনের কারণে আমাদের হয়তো দেরি হয়।
সারাবাংলা: র্যাকার ব্যবস্থা আধুনিক ও শক্তিশালীভাবে আরও উন্নত করা যায় কি না?
ফারুক আহমেদ: হাইওয়েতে আমাদের গাড়ির সংকট আছে। হাইওয়েতে যদি গাড়ি কম থাকে তাহলে তো এই কাজগুলো করা যাবে না। এজন্য আমাদের গাড়ি কেনা এখন সরকারি বাজেট থেকে একটু ডিফিকাল্ট। আমরা একটা প্রজেক্ট নিয়েছি, ১৯০টা পিকআপ। হ্যাভি ক্রেনের রিকোয়ারমেন্ট দেওয়া আছে। সে ক্ষেত্রে এটা হয়ে গেলে, তখন দেখা যাবে রাস্তা থেকে গাড়িগুলো রিমুভ করা অথবা টহল বাড়ানো, এটা আরও উন্নত কারা যাবে।
সারাবাংলা: ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে ওয়েট স্কেল কতটা কার্যকর রয়েছে?
ফারুক আহমেদ: ওয়েট স্কেল আছে। এগুলোকে আরও আধুনিক করার কাজ চলছে। প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। গাড়ি ওজন করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন পাওয়া গেলে যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ওভারলোড যানবাহনের কারণে সড়কের ক্ষতি ও যানজট—দুই-ই হয়।
সারাবাংলা: ড্রোন বা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মহাসড়ক নজরদারি করা সম্ভব?
ফারুক আহমেদ: আমাদের ড্রোন আছে, কিন্তু এটা আপনি আল্টিমেটলি পিকচার ক্যাপচার করতে পারবেন। কিন্তু এখন মনে হয় না ওই রকম সংকট আমরা ফেস করি যে ইনফরমেশনটা পাচ্ছি না। বরং ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে এআই ক্যামেরা আছে, আমাদের এই সুবিধা আছে। যেটা আমরা হয়তো অল্পদিনের মধ্যে স্টার্ট করব। এখন এটা টেস্ট ফেজে আছে। কোনো জায়গায় জট লাগলে, এআই ক্যামেরায় আমাকে সিগন্যাল দিবে। ১০০টা গাড়ি এক জায়গায় জমলে এআই ক্যামেরা আমাকে সিগন্যাল দিবে যে ১০০টার গাড়ি এখানে… মানে ১০০টা গাড়ি হলেই সিগন্যাল দিবে যে এখানে একটা জট দেখা যাচ্ছে। তখন সঙ্গে সঙ্গে আমরা রেসপন্স করতে পারব। যেটা এখন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আছে, কেউ হয়তো ফোন করল বা জানাল। তো এটা আমরা অটো জানতে পারব। এই ব্যবস্থা চালু হলে যানজট শনাক্তে ম্যানুয়াল তথ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে।
সারাবাংলা: বড় দুর্ঘটনার পর বাসের ফিটনেস বা নিবন্ধন না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। আপনারা কীভাবে দেখছেন?
ফারুক আহমেদ: অভিজ্ঞতার আলোকে বলব, সংবাদে যেসব বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তার বাইরের কিছু কারণও গুরুত্বপূর্ণ। ফিটনেসের কারণে দুর্ঘটনা হয়, তবে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার প্রধান কারণ এটি নয়। আমাদের পর্যবেক্ষণে বড় দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ চালকের ভুল। দ্বিতীয়ত, মহাসড়কে ডিভাইডার না থাকা। ডিভাইডার থাকলে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি কমে যায়। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত গতি। প্রশিক্ষিত চালক, সড়কে ডিভাইডার এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে গতি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনা শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডিভাইডার দেওয়ার পর দুর্ঘটনা অনেক কমেছে। সম্প্রতি সিলেট সড়কে যে বড় দুর্ঘটনা হয়েছে, সেখানে ডিভাইডার থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। ফিটনেস গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বড় দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ নয়।
সারাবাংলা: মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল এখনো বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?
ফারুক আহমেদ: এটার আসলে ব্যবসায়িক একটা দ্বন্দ্ব আছে। মালিক শ্রমিকরা যেভাবে বলে, সেটা ঐরকম না। অটো রিকশা চুরি করে সড়কের ডান বা বাম দিক দিয়ে যায়। ফলে ওরা যত বলে, এক্সিডেন্টের পরিমাণ তারচেয়ে কম। ওরা চুরি করে আস্তে আস্তে যায়, এরা জোরেও যায় না। হ্যাভি গাড়িগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ খুব কম হয়। কিন্তু অটো রিকশা হাইওয়েতে ওঠানোও ঠিক না। ঝামেলা তো হয়ই। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।
সারাবাংলা: দুর্ঘটনার পর হাইওয়ে পুলিশের সময়মতো সাড়া না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ফারুক আহমেদ: সমস্যাটি আছে। ট্রাফিক বা হাইওয়ে পুলিশ সময়মতো সাড়া দিলে যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু আমরা সব সময় সময়মতো সাড়া দিই না। আমাদের সেবামূলক মানসিকতা ও মানবিকতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সড়কে যানজটের কারণে মানুষের যে কত ধরনের সমস্যা হতে পারে, সেটা আমরা মানবিক দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করি না। টাইমলি রেসপন্স করলে এটা কমানো সম্ভব, কিন্তু করি না। আমি ট্রাই করছি এই সমস্যা দূর করার। আমি হাইওয়েতে নির্দেশনা দিয়েছি- সড়কে টাকা নেওয়া যাবে না এবং যানজট নিরসনে সহায়ক হতে হবে। এটাই হলো বেসিক কাজ আমাদের। কিছু লিমিটেশন থাকা স্বত্ত্বেও সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। খবর পাওয়া মাত্রই টাইমলি গিয়েছি অথবা আমি যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি—এটা পুলিশকে প্রমাণ করতে হবে।