ঢাকা: জুলাই মামলার আসামি ছিলেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানার কোলা ইউনিয়নের পুর্ব কোলাগ্রামের সন্ত্রাসী সিদ্দিক মোল্লা। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। এর পর জামিনে বেরিয়ে ২০২৫ সালের ৮ মার্চ এক রোজার দিনে জমিজমার বিরোধের জেরে আপন বড়ভাই ইসহাক মোল্লার ডান পা কুপিয়ে আলাদা করে কেটে নেয়। পুরো শরীরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে চালায় তাণ্ডব। ইসহাক মোল্লার করা মামলায় একদিনের জন্যও গ্রেফতার হয়নি আসামিরা। এমনকি পুলিশ টাকা খেয়ে চার্জশিট থেকেও মুল আসামিদের নাম বাদ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে একবছর পর সেই একই জেরে গত ১৯ জুন আপন ভাতিজা ইলিয়াস মোল্লাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ইলিয়াস মোল্লাকে যেদিন হত্যা করা হয় সেই একইদিনে বড়ভাই ইসহাক মোল্লাকে কুপিয়ে আহত করেন। এ সময় পঙ্গু ইসহাক মোল্লার ডান হাতের দুই আঙ্গুল কেটে নেয়। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম হয়। ইলিয়াস মোল্লা মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন। তিনি দেশে এসে হত্যার শিকার হন। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়। আসামিরা গ্রেফতার হলে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিও দেন।
বর্তমানে আসামিদের মধ্যে একজন জামিনে বেরিয়ে ফের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। যাতে মামলা তুলে নেওয়া হয়। না হলে জামিনে বেরিয়ে হত্যার শিকার ইসহাক মোল্লার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের হত্যা করবেন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন হত্যার শিকার প্রবাসী ইলিয়াস মোল্লার স্ত্রী লিপি বেগম। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া খুনি ও সন্ত্রাসী সিদ্দিক মোল্লাসহ সন্ত্রাসীদের নির্মমতার শিকার হয়ে হাত-পা হারানো ইসহাক মোল্লাও উপস্থিত হন।
লিপি বেগম বলেন, ‘চাচা-শ্বশুর ইসহাক মোল্লার সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসী সিদ্দিক মোল্লা, তার স্ত্রী রওশন আরা এবং তাদের দুই পুত্র বিপ্লব মোল্লা ও বিদ্যুৎ মোল্লার আগে থেকেই জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের জের ধরে ২০২৫ সালে আমার চাচা-শ্বশুর ইসহাক মোল্লার ওপর সন্ত্রাসী সিদ্দিক মোল্লার পরিবার হামলা করে তার পা কেটে নেয় এবং চিরতরে পঙ্গু করে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী প্রবাসী ইলিয়াস মোল্লা চেয়েছিলেন বিরোধের মীমাংসা হোক, দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি ফিরে আসুক। সে কারণেই তিনি দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই শান্তির চেষ্টা যেন তার জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়। সন্ত্রাসী সিদ্দিক মোল্লা আমার স্বামীকে হত্যার টার্গেট করে। গত ১৯ জুন শুক্রবার আমার স্বামী তার পঙ্গু চাচা ইসহাক মোল্লাকে হুইলচেয়ারে করে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই হঠাৎ পেছন থেকে একটি অটোতে এসে সন্ত্রাসী সিদ্দিক মোল্লা, রওশন আরা, বিদ্যুৎ মোল্লা ও বিপ্লব মোল্লা আমার স্বামীকে পেছন থেকে রামদা দিয়ে কোপাতে শুরু করে। তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হাতের রগ কেটে ফেলে এবং তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আমার স্বামী বাঁচার জন্য ছটফট করলেও তাকে বাঁচানোর কেউ ছিল না। ইসহাক মোল্লা নিজেও ছিলেন একজন পঙ্গু মানুষ। তিনি হুইলচেয়ারে বসা অবস্থায় কোনো দিকে যেতে পারছিলেন না। সেই অসহায় মানুষটিকেও তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হাতের দুটি আঙুল কেটে ফেলে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম করে। এর পর তারা সেখানে থাকা লোকজনকে রামদা দিয়ে ভয় দেখিয়ে বলে— যে আসবে, তাকেই মেরে ফেলব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী ও চাচা শ্বশুরকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর সেখানে ২০ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার স্বামী মারা যান।’
লিপি বেগম বলেন, ‘স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে সিরাজদিখান থানায় মামলা করি। একে একে খুনি বিপ্লব মোল্লা, বিদ্যুৎ মোল্লা, সিদ্দিক মোল্লা ও রওশন আরা গ্রেফতার হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও আতঙ্কের বিষয় হলো, মাত্র একমাসের মাথায় খুনি রওশন আরা জামিনে বের হয়ে যায়। জামিনে বের হওয়ার পর থেকেই রওশন আরা আমাকে ও আমার পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছে। মামলা না তুললে বাকিদেরও মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছে।’
লিপি বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘এর আগে তারা এক কাজের মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। আসিফ নামে আরেক যুবককেও তারা হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা হওয়ায় তারা কাউকে ভয় পান না। এই সন্ত্রাসীদের সঠিক বিচার করা হোক। না হলে তাদের দ্বারা আরও হত্যাকাণ্ড ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি এও বলেন, পুলিশও যেন নিরপেক্ষ থেকে মামলার চার্জশিট দেয় আদালতে।