Wednesday 12 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ঢামেকের প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি বাতিল, নেপথ্যে কী?

মেহেদী হাসান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১২ আগস্ট ২০২৬ ১০:১৩

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলাম। আর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। গত ২৮ জুলাই এই দু’জনকে রদবদল করে বদলি আদেশ জারি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু ঢামেকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল চেয়ার না ছাড়ার এবং হাসপাতাল পরিচালকের বিরুদ্ধে মোজাম্মেল হকের কাগজপত্র গ্রহণ না করার অভিযোগ ওঠে। আর এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই গত ১০ আগস্ট বদলির প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ফলে প্রশ্ন ওঠেছে কোন অদৃশ্য কারণে বদলির প্রজ্ঞাপন হলো এবং ১৩ দিনের মাথায় সেটি বাতিল করা হলো। তবে কি নেপথ্যে রয়েছে লেনদেন, নাকি কোনো সিন্ডিকেট?

বিজ্ঞাপন

গত ২৮ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) ডা. রেজাউল আহমেদের সই করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের দু’জনকে রদবদলের মাধ্যমে বদলি করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয় ওই প্রজ্ঞাপনে। অন্যথায় চতুর্থ কর্মদিবস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি কার্যকর হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ওই আদেশের পর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ঢামেকে যোগদান করতে এলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার যোগদানের কাগজ গ্রহণ করেনি। ফলে বদলি হওয়া কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম আগের মতোই প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।

তদন্তে জানা যায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলি নিয়ে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এক গ্রুপের দাবি- ‘হাসপাতালের টেন্ডার-সংক্রান্ত বিষয় এবং একটি ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী রেজাউল ইসলামকে বহাল রাখার চেষ্টা করছেন। সেইসঙ্গে এসব সিন্ডিকেটে ডান হাত রেজাউল কাজ করায় তাকে হারাতে চান না হাসপাতাল পরিচালক। সেজন্য ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তার বদলির আদেশটি পুনর্বিবেচনার জন্য বলেন। যে কারণে কর্তৃপক্ষ রেজাউলের বদলি বাতিল করে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার অন্যপক্ষের দাবি, ‘টেন্ডার বাণিজ্য করতে না পাড়ায় ঠিকাদার ও চিকিৎসকদের একটি পক্ষ মোটা অংকের টাকা খরচ করে ঢামেকে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে বদলি করিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করায়। ফলে প্রজ্ঞাপনের পরেও দুই পক্ষ দৃঢ় থাকে তাদের নিজ নিজ সিদ্ধান্তে।’

‘বদলির পরে কেন রয়ে গেলেন?’ জানতে চাইলে ঢামেকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার কাজে কোনো গাফিলতি ছিল না বলে হাসপাতাল আমাকে ছাড়তে চায়নি। টেন্ডার বাণিজ্য যারা করে, তারা একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে টাকা খরচের মাধ্যমে এই বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করায়। তাদের ধারণা, আমি কাজ দিই। কিন্তু এখানে কমিটি যে ডিসিশন নেয়, তার বাইরে যাওয়ার তো কোনো সুযোগ নাই। ওনারা তো ডাক্তার, ওনারা তো আর ব্যবসায়ী না। কিছু লোকের জন্য তদবির নিয়ে আসছে। এখন এ কারণে আমার ওপর ক্ষেপেছে। ওনারাই তদবির করে বদলিটা করিয়েছে। বদলি আদেশ বাতিল হওয়ার পর আবার আমাকে কেন এখান থেকে সরানো হচ্ছে না, এটার জন্য তারা ঝামেলা করছে।’

হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে নাকি আপনার সিন্ডিকেট রয়েছে? এ জন্য পরিচালক আপনাকে ছাড়ছে না?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না না না…। আমি তো প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ওনাদের সঙ্গে আমার দাফতরিক কাজের সম্পর্কটা কোথায়? ডাক্তারদের যে কাজ, ওই কাজের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতাই নাই। সমস্যা হলে অথরিটি দেখবে যে, আমার কোনো সমস্যা আছে কিনা? বা আমি কোনো ঝামেলার লোক কিনা? তার মানে বুঝাই যাচ্ছে যে, ওনারা কাজ চায়। কাজ যদি জেনুইনভাবে পায় পাবে, তাতে তো আমাদের তো কারও কোনো সমস্যা নাই। ব্যক্তিগতভাবে তো কাজ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমার নাই। আমি তো কমিটির কেউই না। কমিটিতে স্যাররা থাকেন, তারপরে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধানরা থাকেন। এখন ওনারা যে ডিসিশনটা দিবে যে কোন জিনিসটা ভালো, কোন কোম্পানির কাগজপত্র আছে, কোন কোম্পানির কাগজপত্র নাই… এবং সব ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আমারা কোনো সম্পর্ক নাই।’

এদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের পক্ষ নিয়ে সোমবার (১০ আগস্ট) সাবেক ছাত্র নেতা ও কিছু জুনিয়র ডাক্তার রেজাউলের বসার রুমে তালা মারতে চান। সে সময়ে ওই রুমে ৪র্থ শ্রেণির এক কর্মচারী বাধা দিতে গেলে তাকে মারধর করা হয়। এরপর আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে এ নিয়ে হাসপাতালে মারামারি ও পরিচালককে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে। পরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে তার কক্ষেই বিক্ষোভ করেন আবাসিক সার্জন ডা. অভি, ডা. নজরুল, ইউরোলজির ডা. আসাদ, ডা. নাহিদ এবং ঢামেকের ৭৩তম ব্যাচের ছাত্রদল নেতা ডা. মিশকাত সহ চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একটা অংশ।

তবে এর পেছনে শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ কমিশনার (এএসপি) ডা. মুহাম্মদ জাবেদ আহমেদ রয়েছেন বলে দাবি পরিচালকের। ডা. জাবেদ কিছুদিন আগেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০২৫ সালে গঠিত বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। গত ৮ আগস্ট ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। তবে এর আগেই ২৭তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্ত এএসপি হিসেবে সারদায় প্রশিক্ষণে যুক্ত হন।

মোজাম্মেল হকের পক্ষের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা জানান, এই পরিচালক আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া দুর্নীতিবাজ। হাসপাতালের এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বদলির সিদ্ধান্ত হয়। সেই বদলি ঠেকিয়ে দেন পরিচালক। কারণ, তারা একসঙ্গে দুর্নীতি করতেন। এ ছাড়া পরিচালক ফ্যাসিস্টের দোসর, জুলাইয়ে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেন।’

বদলির বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকারিভাবে বদলি একটা রুটিন কাজ। রাষ্ট্র যাকে খুশি তাকে বদলি করতে পারেন। কিন্তু এটি নিয়ে কেউ যদি তার ব্যক্তি স্বার্থে জোরপ্রয়োগ করেন, সেটি তো মানা যায় না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। আর ৫ আগস্টের পর থেকে হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. জাবেদ। তার সুবিধার জন্য আমার বিশ্বস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করে যাচ্ছেন।

এদিকে, টেন্ডার বাণিজ্য ও বদলির পেছনে থাকা নিয়ে অভিযোগ ওঠা ডা. মুহাম্মদ জাবেদ আহমেদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একাধিকার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

সারাবাংলা/এমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

মেহেদী হাসান - আরো পড়ুন