Monday 17 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

উচ্চঝুঁকির কূটনীতি / যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার কেন্দ্রে এলো পাকিস্তান

আবু সাঈদ সজল নিউজরুম এডিটর
১১ এপ্রিল ২০২৬ ০০:৪৬ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৭

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাত প্রশমনে অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে এসেছে পাকিস্তান। ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখার পর এবার দেশটির নেতারা শান্তি আলোচনার আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাজধানী ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠক ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ছুটি ঘোষণা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি কেবল একটি বৈঠক নয়, বরং একটি উচ্চঝুঁকির ভূরাজনৈতিক পরীক্ষা।

বিশ্বের দৃষ্টিতে এই আলোচনার গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন দেশ চায় যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হোক, যা দিয়ে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হতো। এটি যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমিয়ে এই নৌপথ পুনরায় সচল করা এখন বৈশ্বিক অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। তবে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ পাকিস্তানের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি বড় ধরনের ঝুঁকিও বহন করছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনা ব্যর্থ হলে পাকিস্তান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগাভাগির কারণে ইসলামাবাদ এক জটিল ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট দেশটিকে একটি “ত্রিমুখী চাপের” মুখে ফেলতে পারে।

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ আবদুল বাসিত বলেন, আলোচনা ভেঙে পড়লে এবং পাকিস্তান প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে দেশটি ‘দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতির’ মুখে পড়তে পারে। গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করায় এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং ইসলামাবাদ এরইমধ্যে জানিয়েছে, তারা সৌদিদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।

এতে ‘পাকিস্তানের তিনটি সীমান্তই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে,’ বলেন বাসিত—যেখানে আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে আগেই উত্তেজনা রয়েছে। ‘এছাড়া পাকিস্তান ৪টি প্রদেশের মধ্যে দুটিতে পূর্ণমাত্রার বিদ্রোহ মোকাবিলা করছে। পাকিস্তান এটি বহন করতে পারবে না।’

বাসিত বলেন, ‘এটি এক ধরনের বিজয়, কারণ বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এই যুদ্ধবিরতি করাতে পারেনি এবং আমরা একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মুখে ছিলাম। পাকিস্তান তা থেকে শান্তির দিকে নিতে পেরেছে।’

তবে এই ঝুঁকির মধ্যেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক উত্থানকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, বিশেষ করে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটনের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পাকিস্তান মুসলিম লীগের সিনেটর মুশাহিদ হুসাইন সৈয়দ জানান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনিরকে ঘনিষ্টজন হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে ডাকেন। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি জানান,  ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পরপরই মুনির তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেন এবং তাকে ‘দুটি প্রাথমিক সাফল্য’ এনে দেন।

প্রথমত, সিআইএর তথ্যের ভিত্তিতে ২০২১ সালের কাবুল বিমানবন্দর হামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় পাকিস্তান, যেখানে অন্তত ১৭০ আফগান ও ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিল।

লোধি বলেন, ‘ট্রাম্প এতটাই কৃতজ্ঞ ছিলেন যে তিনি কংগ্রেসে তার প্রথম ভাষণে এটি উল্লেখ করেছিলেন।’

দ্বিতীয় সাফল্য হিসেবে তিনি বলেন, পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া কয়েকটি দেশের একটি। এরপর ‘ভারতের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ট্রাম্প।’

লোদি আরও বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, ট্রাম্প তখন বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে খুব একটা সাফল্য পাচ্ছিলেন না। তাই পাকিস্তান থেকে পাওয়া এই সাফল্য তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের কাছে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন—যা সেনাবাহিনীর অধীনে পরিচালিত—একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করে।

এরপর জানুয়ারিতে পাকিস্তান ট্রাম্প ও তার পরিবারের সহ-প্রতিষ্ঠিত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়ালসের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে, যা দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় তাদের স্টেবলকয়েন সংযুক্ত করতে পারে। এতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।

একই সঙ্গে পাকিস্তান “ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি” অনুসরণ করে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থাও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা, অন্যদিকে ইরানের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের সমালোচনা—এই দ্বিমুখী অবস্থান ইসলামাবাদকে একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থানে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ এই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিয়েছে।

পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, আফগানিস্তান ইস্যুতে অভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংযোগ—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগের ভিত্তি রয়েছে। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়েই ইসলামাবাদ নিজেকে একটি “সেতুবন্ধনকারী রাষ্ট্র” হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

তবে সামনে পথ সহজ নয়। যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে, বিশেষ করে লেবানন ফ্রন্টে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—তাদের মিত্রদের সংযত রাখা এবং আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা।

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ  দুররানি বলেন, ‘পাকিস্তান ইতোমধ্যেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজের ভূমিকা পালন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আপনার কাজ হলো ঘোড়াকে পানির কাছে নিয়ে যাওয়া। তাকে পানি খাওয়ানো আপনার কাজ নয়। পাকিস্তান যে সুযোগ তৈরি করেছে, তা কাজে লাগানো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর নির্ভর করে।’

সবশেষে, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে একটি ‘সুযোগ ও ঝুঁকির মিশ্রণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা আলোচনার মঞ্চ তৈরি করতে পেরেছে কিন্তু চূড়ান্ত সমাধান নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সদিচ্ছা ও সমঝোতার ওপর। এই প্রক্রিয়া সফল হলে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারবে। ব্যর্থ হলে, সেটি দেশটির জন্য কৌশলগত চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


বিবিসি থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে ভাবানুবাদ।

বিজ্ঞাপন

আজও ঢাকার বাতাস মাঝারি
১৭ আগস্ট ২০২৬ ১৩:১৫

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর