Thursday 02 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জুলাইয়ের দিনলিপি / শাহবাগ মোড় অবরোধ করে হাজারো শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৩

শাহবাগ মোড় অবরোধ করে হাজারো শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০২৪ সালের ২ জুলাই ছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন। এদিন রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ অত্যন্ত সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ গড়ে তোলে তারা। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন।

বিজ্ঞাপন

শাহবাগ চত্বর যখন প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু

২ জুলাই বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও বাটা সিগন্যাল মোড় ঘুরে শাহবাগে গিয়ে জমায়েত হয়। বিকেল তিনটা থেকে পৌনে পাঁচটা পর্যন্ত তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘আঠারোর পরিপত্র-পুনর্বহাল করতে হবে’, ‘কোটা প্রথা নিপাত যাক- মেধাবীরা মুক্তি পাক’ এবং ‘ছাত্রসমাজ গড়বে দেশ, মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ’ এর মতো স্লোগান শোনা যায়। শাহবাগে শুধু অবরোধই হয়নি, এটি হয়ে উঠেছিল এক মুক্ত চত্বর, যেখানে ইতিহাস, অধিকার ও গণতন্ত্রের কথা একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। পরে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে আন্দোলনকারীরা মূল সড়ক ছেড়ে দিলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আন্দোলনের পটভূমি ও ২০১৮ সালের পরিপত্র

এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের স্মৃতি থেকে। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল, যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ নির্ধারিত ছিল।

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করে মন্ত্রিসভা। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোটা পদ্ধতি সংশোধন করে পরিপত্র জারি করে, যার মাধ্যমে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। তবে ২০২১ সালে সেই পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। গত ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সেই পরিপত্রের ওই অংশটিকে অবৈধ ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ আবারও মাঠে নামতে বাধ্য হয়।

সমন্বিত প্রতিরোধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

২ জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা দেশব্যাপী এক সমন্বিত প্রতিরোধে রূপ নেয়। এদিন বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে তারা প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক প্রায় ২৫ মিনিট অবরোধ করে রাখেন এবং পরে সেখানে সমাবেশ করেন। এ ছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাল চত্বর থেকে ব্যানারসহ বিক্ষোভ মিছিল বের করেন, যা ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ, কুমিল্লায় আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ এবং চট্টগ্রামে শহিদ মিনার চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়।

নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও পরবর্তী কর্মসূচি

বিক্ষোভ মিছিলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটি শুধু শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক জিনিস নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো বংশগত পরম্পরার বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ, যা তরুণেরা ধারণ করে এবং সে জন্যই তারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছে।’ এই দাবি আদায়ে ৩ জুলাই বেলা আড়াইটায় আন্দোলনকারীরা আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেবেন বলে তিনি জানান।

এই অবস্থান কর্মসূচি দেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একই ব্যানারে একই সময়ে পালনের আহ্বান জানান নাহিদ। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আব্দুল কাদির বলেন, ‘চার দফা দাবিতে এই আন্দোলন আগামী ৪ জুলাই হাইকোর্টের শুনানি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রসমাজ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টি সবকিছু উপেক্ষা করে ন্যায্য আন্দোলন জারি রাখবে।’

আন্দোলনকারীদের চার দফা দাবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত চার দফা দাবির মধ্যে প্রধান ছিল ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রাখা। এর পাশাপাশি পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেওয়া, যেখানে সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ছাড়া সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা আজ
২ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩৫

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর