ঢাকা: ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। দিনাজপুরের এক মফস্বল শহরে ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের কোলজুড়ে জন্ম নেয় এক শিশু। বাবা-মা নাম রাখলেন খালেদা খানম পুতুল। কে জানতো, উত্তরবঙ্গের সবুজ মাঠ আর পুকুরে শাপলা কুড়িয়ে বড় হওয়া সেই শান্ত মেয়েটিই একদিন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত ও প্রভাবশালী চরিত্র হয়ে উঠবেন?
আজ ১৫ আগস্ট, বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান, এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই ও সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তিনি। তার জীবন মানেই এক হার না মানা অদম্য নেত্রীর গল্প।
শৈশব ও তারুণ্যের দিনলিপি
শৈশবের দিনগুলো কেটেছে উত্তরবঙ্গের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয়। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আসা সেই তরুণীর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৬০ সালে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সেনা-পরিবারের ছকে বাঁধা শৃঙ্খলিত জীবন, দেশের নানা প্রান্তে বদলি— সবই তিনি মেনে নিয়েছিলেন অত্যন্ত ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে। ১৯৭১ সালের উত্তাল সময়ে কাছ থেকে দেখেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, আর বীরত্বের সেই অধ্যায় তাকে শিখিয়েছিল অকুতোভয় হতে।
রাজনীতির পথে আকস্মিক যাত্রা
১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রায় শূন্য থাকার পরও দলের নেতাকর্মীদের আকুল আবেদনে তিনি হাল ধরেন। গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপির প্রধান। তখনো তিনি জানতেন না, এই পথটি কন্টকাকীর্ণ।
আপসহীন নেত্রীর উত্থান
আশির দশকের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সামরিক স্বৈরাচারের প্রধান প্রতিপক্ষ। তার আপসহীন অবস্থানের কারণেই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান। তার শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষার বাধ্যতামূলক প্রসারে ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি এবং নারী শিক্ষার উন্নয়নে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো আজও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাইলফলক হয়ে আছে।
সংগ্রাম, বন্দিত্ব ও নির্বাসন
ক্ষমতার বাইরে থাকা মানেই তার ওপর নেমে আসা নানা ঝড়-ঝাপটা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নানা মামলা, হয়রানি আর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি বারবার। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। অসুস্থতা ও বয়সের ভারেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ২০১০ সালে তার পুরোনো সরকারি বাসভবন থেকে উচ্ছেদ হওয়ার দৃশ্যটি ছিল লাখো ভক্তের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো।
২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ড হওয়ার পর দীর্ঘ কারাবাসে তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে। কিন্তু তিনি বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারের দেওয়া শর্ত মেনে মাথা নত করেননি। ২০২০ সালের মার্চে নির্বাহী আদেশে মুক্তি পাওয়ার পরও তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়, কিন্তু মানসিকভাবে অদম্য।
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি ও সম্মাননা
বিশ্বজুড়ে তার নেতৃত্বের স্বীকৃতি মিলেছে নানাভাবে। ২০১১ সালের ২৪ মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোনো বিদেশিকে এমন সম্মান দেওয়ার ঘটনা ছিল এটিই প্রথম। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননায় ভূষিত করে।
মহাজীবনের সমাপ্তি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এক বৈপ্লবিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের মানুষের মনে আবারও নতুন করে আশা সঞ্চারিত হয়। দীর্ঘ বন্দিদশা ও অসুস্থতাকে পেছনে ফেলে দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়ে তিনি শান্তির আহ্বান জানান। চিকিৎসার প্রয়োজনে অবশেষে তিনি বিদেশ যাত্রা করেন। দীর্ঘ আট বছর পর গত ঈদে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ ও নাতনিদের সঙ্গে কাটানো তার হাসিমাখা ছবিগুলো ছিল এক মমতাময়ী মায়ের প্রশান্তির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দেশে ফেরার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর এক মহাজীবনের যাত্রা থেমে যায়।
বর্তমান বাস্তবতা ও অনুপ্রেরণা
বেগম খালেদা জিয়া বাস্তবে না থাকলেও বিএনপির ভেতরে তার প্রভাব অটুট। তার প্রতিটি নিঃশ্বাস আজও লাখো নেতাকর্মীর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। শৈশবের শান্ত মেয়েটি থেকে আজকের ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বেগম খালেদা জিয়ার জীবন শিখিয়েছে- প্রতিকূলতা যতই বড় হোক, দৃঢ় মনোবল আর আপসহীন থাকলে মানুষ নিজের জায়গা ইতিহাসে ঠিকই তৈরি করে নিতে পারে। খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির এক অপরাজেয় গল্পের নাম।