ঢাকা: রাজপথ কাঁপছে স্লোগানে, থমকে গেছে ট্রেনের চাকা । ২০২৪ সালের ৩ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সেদিন রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব গণবিস্ফোরণে। ঢাকার শাহবাগ থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের রেললাইন; সবখানে তখন শুধু অধিকার আদায়ের লড়াই। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নেমে আসেন রাজপথে, যা কেবল একটি সাধারণ বিক্ষোভ ছিল না, ছিল তরুণ প্রজন্মের মেধা ও ন্যায্যতার অধিকার প্রতিষ্ঠার এক জ্বলন্ত দলিল।
ঢাবিতে বিক্ষোভ ও শিক্ষার্থীদের ৫ দফা
বিকেল ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনের ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এই মিছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজের হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী অংশ নেন। মিছিলটি শাহবাগ ও ক্যাম্পাস ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেইটের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল থেকে শিক্ষার্থীরা পাঁচটি মূল দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো-
- ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রেখে কোটা সংস্কার কমিশন গঠন করা।
- অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ছাড়া অন্য কোনোপ্রকার ‘অযৌক্তিক কোটা’ বাতিল করা।
- একই ব্যক্তি যেন একাধিকবার কোটার সুযোগ না পায় তা নিশ্চিত করা।
- কোটায় যোগ্য প্রার্থী না থাকলে মেধাভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া।
- দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীরা বেলা আড়াইটায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেওয়ার পর বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মৎস্য ভবন হয়ে শাহবাগে যান। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখার পর বিকেল সোয়া ৫টার দিকে তারা শাহবাগ মোড় ত্যাগ করেন।
জাহাঙ্গীরনগরে মহাসড়ক অবরোধ
একইদিন বিকেল সোয়া ৩টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। অবরোধ চলাকালে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের গাড়িবহর আটকে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এই সময় সংসদ সদস্যের সঙ্গীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কিছুটা বাকবিতণ্ডা হয়। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে স্থান ত্যাগ করেন। দেড় ঘণ্টার এই সড়ক অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অবশেষে বিকেল ৪টা ৫৩ মিনিটে শিক্ষার্থীরা তাদের অবরোধ তুলে নেন।
পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক অবরোধ
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে এই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি। পুরান ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এই মোড়ে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি সম্পন্ন করেন এবং কোটা সংস্কারের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রেলপথ অবরোধ
ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরা এদিন সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও সাহসী কর্মসূচি পালন করেন। দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে একটি প্রতিবাদ সভা শেষে শিক্ষার্থীরা আবদুল জব্বার মোড়ে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় মিছিল করেন। এরপর বেলা ১টা ২০ মিনিট থেকে ২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত তারা রেলপথ অবরোধ করে রাখেন। শিক্ষার্থীদের এই রেললাইন অবরোধের কারণে ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জগামী ‘মহুয়া এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি এক ঘণ্টার জন্য আটকে থাকে। এটিই ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রথম রেলপথ অবরোধের ঘটনা।
চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের অবস্থান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেইট এলাকায় বেলা পৌনে ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত এই সড়ক অবরোধ চলে। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রাখা এবং হাইকোর্টের রায় বাতিল করা। অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীরা কোটাব্যবস্থা বিরোধী এবং মেধাবীদের অধিকার আদায়ের পক্ষে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন।
নাহিদ ইসলামের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা
শাহবাগে আন্দোলনকারীদের পক্ষে বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ের পর থেকে আমাদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। আমরা মাঝখানে আলটিমেটাম দিয়েছিলাম, কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে আমাদের আবারও রাজপথে নেমে আসতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামীকাল হাইকোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি হবে। আমরা আশা করব, সেই শুনানি শিক্ষার্থীদের পক্ষে হবে। আমরা যে চার দফা দিয়েছি, তার প্রথম দফা যেন আগামীকালের মধ্যেই পূরণ করা হয়। প্রথম দফা শেষে আমাদের বাকি দফাগুলো যাতে পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হয়।’
পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল বেলা ১১টায় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেব এবং যতক্ষণ না আমাদের পক্ষে রায় আসছে, আমাদের প্রথম দফা পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
জনজীবন ও সার্বিক পদক্ষেপ
৩ জুলাইয়ের এই আন্দোলন ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক ও দেশব্যাপী অবরোধের কারণে বিভিন্ন শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বিকল্প রুটের নির্দেশনা জারি করে। কোনো কোনো স্থানে স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধ সাপেক্ষে শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন। এই আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমাজের বহু স্তরের সাধারণ মানুষের চোখ ছিল রাজপথের দিকে।