Saturday 04 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জুলাইয়ের দিনলিপি / কোটা বাতিল নিয়ে ‘নট টুডে’ আদেশ, দেশব্যাপী উত্তাল ছাত্র-জনতা

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৪ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৯

জুলাইয়ের দিনলিপি।ফাইল ছবি

ঢাকা: একদিকে আকাশ ভেঙে নামা ঝুম বৃষ্টি, অন্যদিকে রাজপথ কাঁপানো তপ্ত স্লোগান; ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা!’ ২০২৪ সালের ৪ জুলাই, এক অস্থির বৃহস্পতিবার। প্রকৃতি যেন সেদিন তরুণদের মনের ভেতরের ক্ষোভ আর দ্রোহের সঙ্গে তাল মিলিয়েই মেঘের গর্জন তুলেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে শাহবাগ, পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার থেকে শুরু করে দেশের দূর-দূরান্তের মহাসড়কগুলো সেদিন স্থবির হয়ে পড়েছিল এক অনমনীয় দাবিতে। চার বছরের ব্যবধানে আদালতের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেভাবে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধে রূপ নিয়েছিল, তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা।

বিজ্ঞাপন

আদালতের ‘নট টুডে’ এবং ক্ষোভের আগুন

২০১৮ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিল সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সেই পরিপত্রকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করলে নতুন করে কোটা বহাল হয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ৪ জুলাই ছিল সেই বহুল প্রতীক্ষিত শুনানির দিন। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চে রিট আবেদনকারী পক্ষের সময় চাওয়ার প্রেক্ষিতে আদালত ‘নট টুডে’ (আজ নয়) বলে আদেশ দেন এবং হাইকোর্টের রায় আপাতত বহাল রাখেন।

আদালতের এই অবস্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। আন্দোলনকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাহী বিভাগ কোটা বাতিল করে আর বিচার বিভাগ তা পুনর্বহাল করে। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যকার চরম সমন্বয়হীনতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে এক ধরনের প্রহসন। এই আইনি মারপ্যাঁচ তরুণদের ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার বদলে তাদের রাজপথে আরও বেশি দৃঢ় অবস্থানের দিকে ঠেলে দেয়।

উত্তাল শাহবাগ মোড়

সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল মেঘলা ও গুমোট। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন শত শত শিক্ষার্থী। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে বিশাল একটি মিছিল সূর্যসেন হল, মুহসীন হল, ভিসি চত্বর ও রাজু ভাস্কর্য হয়ে দুপুর ১২টার দিকে শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই অবরোধে যোগ দেন।

পরবর্তীতে দুপুরের দিকে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। কিন্তু বৃষ্টিও দমাতে পারেনি সেই দ্রোহের আগুন। ছাতা মাথায় কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শাহবাগ মোড়ে বসে পড়েন। ফলে টানা ছয় ঘণ্টা ঢাকার এই অন্যতম প্রধান মোড়টি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ থাকে। এই অবস্থান কর্মসূচি কেবল একটি সাধারণ অবরোধ ছিল না, এটি ছিল তরুণদের চেতনার এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। বিকেল ৫টার দিকে শাহবাগে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘আমরা এখানে একঘণ্টার জন্য আসিনি। দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব।’

ছাত্রলীগের বাধা উপেক্ষা করে হল বর্জন

আন্দোলনকে স্তিমিত করতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) পক্ষ থেকে বিভিন্ন হলে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো হলের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক গেস্টরুমে আটকে রাখা হয়। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ারের সামনে সেই বাধা টেকেনি। আন্দোলনকারীরা নিজেরা সংগঠিত হয়ে হলের তালা ভাঙতে বাধ্য করেন এবং প্রতিটি বিভাগ ও ব্যাচ থেকে দলে দলে এসে আন্দোলনে যোগ দেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া উপস্থিতি এবং স্লোগানে মুখর অংশগ্রহণ এই দিনটিতে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল।

ঢাকাসহ সারাদেশে ব্লকেড, স্তব্ধ মহাসড়ক

৪ জুলাইয়ের আন্দোলনের আগুন শুধু ঢাকার শাহবাগেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো বাংলাদেশে। দুপুরের পর থেকে দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন-

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: পুরান ঢাকার জবি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে মিছিল নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়সাহেব বাজার মোড় অবরোধ করেন, যার ফলে সদরঘাটমুখী সমস্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

  • জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরোধ করে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করেন।
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে জমায়েত শেষে রাবি শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন।
  • চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: চবি শিক্ষার্থীরা রেললাইন ও চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
  • ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন ইবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এ ছাড়াও খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও সড়ক অবরোধের কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হয়। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত সংযমের সাথে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই অবরোধ ধরে রাখেন, ফলে কোথাও বড় কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

নতুন কর্মসূচির ডাক ও চূড়ান্ত ধর্মঘট

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পর শাহবাগ মোড় থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা পুনরায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে জড়ো হন। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে পরবর্তী তিন দিনের চব্বিশ ঘণ্টার নতুন ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৫ জুলাই শুক্রবার দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার অনলাইন ও অফলাইন মতবিনিময়, ৬ জুলাই শনিবার বিকেল ৩টায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৭ জুলাই রোববার থেকে সারা দেশে সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। ৪ জুলাইয়ের এই অভূতপূর্ব ছাত্রজাগরণই মূলত পরবর্তী সময়ে পুরো জুলাই জুড়ে চলা এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর