ঢাকা: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট । কিন্তু জুলাই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩৫ জুলাই। দিনটিতে ঢাকার আকাশ ছিল এক উত্তপ্ত অগ্নিগর্ভ। বাতাসের ছত্রে ছত্রে গোলাবারুদের গন্ধ, বারুদ আর টিয়ার শেলের ঝাঁজালো ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে গিয়েছিল। প্রকৃতি যেন এক অলক্ষ্য নীরবতায় স্তব্ধ হয়ে চেয়ে দেখছিল, আর রাজপথে তৈরি হচ্ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস। সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে পুরো বাংলাদেশজুড়ে সরকারি বাহিনীর গুলিতে ও হামলায় ঝরে ৯৩টি তাজা প্রাণ।
রাজধানীজুড়ে নিহতদের স্বজনদের আহাজারি আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করুণ দৃশ্যপট স্পষ্ট করে দিয়েছিল, এটি আর কেবল কোনো সাধারণ প্রতিবাদ নয়, দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন প্রতিরোধ পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। ঠিক এই অগ্নিগর্ভ দিনটিতেই রাজপথ থেকে ভেসে আসে আন্দোলনের নতুন বার্তা, যার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে শেখ সরকারের বিদায়ের ক্ষণগণনা।
এক দফা দাবিতে শাহবাগের অগ্নিগর্ভ জনসমুদ্র
বিকেল হতে হতেই রূপসী বাংলার মোড় থেকে টিএসসি পেরিয়ে শাহবাগের সড়কগুলো রূপ নেয় উত্তাল জনসমুদ্রে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রতিনিধিরা যখন মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে এক দফার স্পষ্ট ঘোষণা দেন, তখন পুরো শাহবাগ কেঁপে ওঠে লাখো মানুষের সমবেত গর্জনে। সবার কণ্ঠে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল একটাই স্লোগান- ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ চাই’।
তবে এই অভূতপূর্ব গণজাগরণকে স্তব্ধ করে দিতে সরকারের দমননীতি ছিল সমানমাত্রায় হিংস্র। আন্দোলন থামানোর উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র তার সমস্ত শক্তির প্রয়োগ শুরু করে। টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর তাজা বুলেটের আঘাতে একের পর এক তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু গুলির শব্দ ছাপিয়ে শাহবাগের আকাশে বাতাসে তখন ভাসছিল এক রক্তাক্ত ও অকুতোভয় স্লোগান, যার প্রতিটি শব্দ শোষকের সিংহাসন কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
একদিন আগেই রাজপথে নামার চূড়ান্ত আহ্বান
প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর ‘মার্চ টু ঢাকা’র মূল কর্মসূচি ৬ আগস্ট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মাত্রা বাড়তে দেখে আগের রাতেই পুরো হিসাব বদলে যায়। আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা মুহূর্তের মধ্যেই কর্মসূচি এগিয়ে এনে পরদিনই সবাইকে ঢাকার পথে নামার ডাক দেন। ‘সবাই ঢাকায় আসুন’ এই একটিমাত্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরদিন রাজপথে নেমে আসে ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, অভিভাবক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
কিন্তু রাজপথ দখল নিতে গিয়ে পুরো ঢাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মহাখালী এবং উত্তরায় দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে একের পর এক নিথর দেহ এসে পৌঁছাতে থাকে। শহরের বাইরের জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল মৃত্যুর ভয়াল ছায়া, যা গণমানুষের ভেতরের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে পুরোপুরি বিস্ফোরিত করে।
জাগরণের সেনাস্যালুট আর জীবনাহুতির নতুন ইতিহাস
দমনপীড়ন যখন চরমে, ঠিক তখনই সাভার ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ঘটে এক স্মরণীয় ঘটনা। সংঘাতপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ শেষে উড্ডয়নরত সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারের দরজা থেকে এক সেনা কর্মকর্তা নিচে আন্দোলনরত বিপুল জনতার উদ্দেশে শ্রদ্ধায় হাত নাড়িয়ে আবেগঘন স্যালুট জানান।
এই একটিমাত্র দৃশ্য মুহূর্তে আন্দোলনকারীদের বুকে নতুন সাহসের সঞ্চার করে। অন্যদিকে, উত্তরার উত্তাল সড়কে রাষ্ট্রের বুলেটে বুক পেতে দিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়ার (নিলয়) মতো অদম্য তরুণেরা। রক্তের বিনিময়ে বীর সন্তানদের এই বলিদান দমানোর বদলে সাধারণ মানুষের অদম্য জেদ আর প্রতিজ্ঞাকে আরও শতগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শাটডাউন ও কারফিউর অন্ধকার পেরিয়ে নতুন দিগন্ত
সন্ধ্যা নামতেই দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে সরকার জারি করে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। দ্বিতীয়বারের মতো পুরো দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ফোর-জি সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, ঘোষণা করা হয় টানা তিন দিনের সরকারি ছুটি। উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দেশের এই গণচেতনাকে থামিয়ে দেওয়া। কিন্তু ততক্ষণে এই গণআন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।
বরিশাল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লাহসহ দেশের ১৫টিরও বেশি জেলায় হাজারো সাধারণ মানুষ কারফিউর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। অন্যদিকে, দেশের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিকল্প অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করা হয়।
শাসকের গুলি আর দমননীতি পেরিয়ে সেদিনই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল পরবর্তী দিনের গতিপথ। ৪ আগস্ট কেবল রক্তের ইতিহাস ছিল না, ছিল এক পরাধীন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে স্বৈরাচারমুক্ত নতুন ভোরের আবাহন।