ঢাকা: ক্যালেন্ডারে ২ আগস্ট ২০২৪। কিন্তু আন্দোলনরত মানুষের কাছে সেটি ছিল ‘৩৩ জুলাই’। কারণ জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলো তখনও শেষ হয়নি। ভোর থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল মেঘলা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নেমেছিল, কিন্তু সেই বৃষ্টি রাজপথের উত্তাপ কমাতে পারেনি। ছাতা হাতে কিংবা ভিজে শরীরেই মানুষ নেমে এসেছিলেন পথে। চারদিকে একটাই উচ্চারণ— ‘গুলিতে মরতে পারি, পিছু হটব না।’
সেদিনের বাংলাদেশে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষক, শিল্পী, লেখক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শ্রমজীবী মানুষ—সমাজের নানা স্তরের মানুষ রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিলেন একই দাবিতে। আর রাতের শেষে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়—ঘোষণা আসে ৩ আগস্ট গণমিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচির।
ডিবি হেফাজতের সমন্বয়কদের ভিডিও বার্তা নিয়ে সত্যতা প্রকাশ
দিনটির শুরুতেই আলোচনায় আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়কের ভিডিও বার্তার বিষয়টি। ডিবি কার্যালয় থেকে মুক্তির পরপরই নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নুসরাত তাবাসসুম ও আবু বকর মজুমদার জানান, ডিবির হেফাজতে থাকাকালে গত ২৮ জুলাই রাতে প্রচারিত আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তাটি জোরপূর্বক এবং স্ক্রিপ্টেড ছিল।
তারা স্পষ্ট করে জানান, পরিবারকে না জানিয়ে আটকে রাখা, মানসিক নির্যাতন এবং অনশনরত অবস্থায় জোর করে খাবার খাইয়ে নাটক সাজানোর ঘটনাটি ছিল তাদের আত্মসম্মানে গভীর আঘাত। কোনো বেআইনি ও অসাংবিধানিক চাপ তাদের দমাতে পারেনি। বের হয়েই তারা স্পষ্ট বার্তা দেন- ‘আন্দোলন থামেনি, ছাত্র-জনতা হত্যার বিচার ও সব নিরপরাধ মানুষের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।’
বৃষ্টির মধ্যে রাজপথে ‘দ্রোহযাত্রা’
জুমার নামাজ শেষ হতেই বাইতুল মোকাররম, প্রেস ক্লাব, সায়েন্সল্যাব, উত্তরা, মিরপুর, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীসহ সারাদেশের মসজিদগুলো থেকে বেরিয়ে আসে মিছিলের জনস্রোত। সায়েন্সল্যাব ও ধানমন্ডি এলাকায় জমা হওয়া জনতার ঢল মুহূর্তের মধ্যে জনসমুদ্রে রূপ নেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই সায়েন্সল্যাবে সমবেত হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে- ‘এক দাবি দফা এক দাবি এক, হাসিনার পদত্যাগ।’
জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার পর্যন্ত আয়োজিত হয় বিশাল ‘দ্রোহযাত্রা’। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবক, শিক্ষক, আইনজীবী, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটেন। দ্রোহযাত্রায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘এই সরকার ছাত্রদের রক্তে হাত রঞ্জিত করেছে। তাদের পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
শিল্পী, লেখক ও শিক্ষকদের রাজপথ দখল
২ আগস্টের রাজপথ শুধু শিক্ষার্থীদের ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সর্বস্তরের মানুষের দ্রোহের মঞ্চ। ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’-এর ব্যানারে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান দেশের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী, পরিচালক ও সংস্কৃতি কর্মীরা।
একই দিনে ‘পোয়েটস অ্যান্ড রাইটারস অ্যাগেইনস্ট কান্ট্রিওয়াইড অ্যারেস্টস অ্যান্ড অপ্রেশন’-এর ব্যানারে কবি, লেখক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকাশকরা সোচ্চার হন। ‘প্রতিবাদ মঞ্চ’-এর ব্যানারে রাজপথে নামেন শিক্ষক, অধিকারকর্মী ও চিকিৎসকরা। এর সাথে সংহতি জানিয়ে আন্দোলনের পালে নতুন হাওয়া দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২৬ জন শিক্ষক, যারা প্রকাশ্যে যৌথ বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।
রাজধানীর বাইরে রক্তাক্ত সংঘাত
রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে ২ আগস্ট সংঘাতের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রান্তিক জেলাগুলোতেও। হবিগঞ্জ, খুলনা, সিলেট, নরসিংদী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলসহ অন্তত ১০টি জেলায় পুলিশ ও শাসকদলের কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। হবিগঞ্জে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে ৩ জন নিহত হন এবং আহত হন শতাধিক। খুলনায় পিটুনিতে এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন। ঢাকার উত্তরায় আন্দোলনকারীদের ওপর আওয়ামী লীগের কর্মীরা হামলা চালালে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে; পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হন ৩ জন। সারাদেশে এদিন সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ৩৭০ জন।
সেদিন আন্তর্জাতিক মহল থেকে সবচেয়ে মর্মান্তিক তথ্য উঠে আসে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিবেদনে। সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, কেবল জুলাই মাসেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অন্তত ৩২ জন শিশুর নির্মম মৃত্যু ঘটেছে।
৫ ঘণ্টা বন্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চিরুনি অভিযান
জনতার এই অভূতপূর্ব জোয়ার স্তব্ধ করতে প্রশাসন মরিয়া হয়ে ওঠে। সরকারি নির্দেশে ২ আগস্ট দুপুর ১২টার পর থেকে টানা ৫ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও মেসেঞ্জার। একই সঙ্গে বন্ধ করা হয় এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম।
অফলাইনেও থেমে ছিল না ‘দমনযন্ত্র’। ১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া চিরুনি অভিযানে ২১ জুলাইয়ের পর থেকে গ্রেফতারের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আগস্টের প্রথম দিনকয়েকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করে পুলিশ, যাদের বড় অংশই ছিল সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। অন্যদিকে, তৎকালীন সরকারের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একে ‘সরকার পতনের চক্রান্ত’ হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেন যে, দাবি মানার পরও একটি নির্দিষ্ট চক্র উসকানি দিচ্ছে।
রাতের ঘোষণায় আন্দোলনের নতুন মোড়: ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’র ডাক
দিনভর কর্মসূচির পর রাতেই আসে আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। দিনভর রাজপথে দ্রোহের আগুন জ্বালানোর পর, রাতে আন্দোলনকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই ঐতিহাসিক ঘোষণা আসে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের ৩ সমন্বয়ক মাহিন সরকার, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আব্দুল হান্নান মাসউদ ৩ আগস্ট দেশব্যাপী গণমিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলনের ডাক দেন।
ফেসবুক লাইভে এসে সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ দেশের আপামর জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘কেউ ট্যাক্স দেবেন না, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের বিল দেবেন না। সচিবালয়সহ সব সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। গণভবন ও বঙ্গভবনে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সরকারকে কেউ কোনো সহযোগিতা করবেন না, যাতে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্র আর চলতে না পারে।’
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘোষণা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সেদিন রাজপথে কেবল প্রতিবাদ হয়নি; আন্দোলনের লক্ষ্যও আরও স্পষ্ট হয়। বৃষ্টিভেজা দ্রোহযাত্রা, শিল্পী-শিক্ষক-লেখকদের অংশগ্রহণ, সমন্বয়কদের অবস্থান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত এবং রাতের অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা—সব মিলিয়ে ২ আগস্ট প্রমাণ করেছিল, আন্দোলন আর কোনো একক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে পুরো দেশ তখন দাঁড়িয়ে ছিল এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়।