Wednesday 30 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / মেধার লড়াইয়ে আদালতের স্থিতাবস্থা, ‘বাংলা ব্লকেডে’ অচল দেশ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১০ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩৬ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ ২৩:৪০

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ১০ জুলাই ২০২৪। ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর ছুঁইছুঁই। ঢাকার ব্যস্ততম কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ের সমান্তরাল লাইনের ওপর আচমকাই আড়াআড়িভাবে এসে পড়ল কয়েকটি ভারী কাঠের গুঁড়ি। মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল ঢাকাগামী একটি লোকাল ট্রেনের চাকার গতি, ইঞ্জিনের তীব্র হুইসেল ছাপিয়ে তখন শত শত তরুণের কণ্ঠ থেকে আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে একটাই স্লোগান ‘মেধা না কোটা? মেধা, মেধা!’ শুধু এই একটি রেলক্রসিংই নয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থার আদেশ আসার পরও সেই আইনি ধোঁয়াশাকে প্রত্যাখ্যান করে সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিল হাজার হাজার শিক্ষার্থী।

দুপুরের পর ঢাকার শাহবাগ চত্বর থেকে শুরু করে মহাখালী ফ্লাইওভার, আর মফস্বলের শান্ত জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রধান মহাসড়কগুলো যেন এক অলিখিত অবরুদ্ধ উপাখ্যানে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছিলেন, তারা কোনো ঝুলন্ত আশ্বাস বা আইনি গোলকধাঁধায় নিজেদের অধিকারকে হারাতে দেবেন না। এই অনড় অবস্থানই মূলত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই দিনটিকে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক মাইলফলক হিসেবে গেঁথে দেয়।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টের স্থিতাবস্থা, মাঠের বজ্রকঠিন প্রত্যাখ্যান

১০ জুলাই সকাল থেকেই সারা দেশের মানুষের চোখ ছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দিকে। এর আগে গত ৫ জুন হাইকোর্ট বেঞ্চ সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন, যার ফলে সারা দেশে নতুন করে কোটা প্রথা ফিরে আসে। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ এদিন হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের অর্থাৎ এক মাসের স্থিতাবস্থা জারির আদেশ দেন।

আদালত এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার এবং জনভোগান্তি না করার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু মাঠের বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ তাৎক্ষণিকভাবে এক লিখিত বার্তায় আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ছাত্রনেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, তারা কোনো ঝুলন্ত বা সাময়িক সিদ্ধান্ত মানবেন না। তাদের আন্দোলন কোনো আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাছে স্থায়ী আইনি সমাধানের দাবিতে। মেধার ভিত্তিতে যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে সংসদে নতুন আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিরোধ ভাঙার কোনো সুযোগ নেই।

২৫ পয়েন্ট অবরোধে স্থবির রাজধানী, অচল রেলপথ

আদালতের আদেশের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে শিক্ষার্থীদের জটলা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এটি ছিল আন্দোলনের টানা তৃতীয় দিনের ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি। ঢাকার বুকে নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কাঁটাবন, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মহাখালী এবং প্রগতি সরণির মতো ২৫টিরও বেশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ঢাকার অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রবেশমুখ এবং মগবাজার-সাতরাস্তা ফ্লাইওভারও আন্দোলনকারীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

মহাখালী ও কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ে কাঠের গুঁড়ি ফেলে দেওয়ায় ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং নগরের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পুরো ঢাকা শহর যেন এক অচল ও নিশ্চল দ্বীপে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়লেও শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য অধিকারের লড়াইয়ের প্রতি ভেতরে ভেতরে এক নীরব নৈতিক সমর্থনও তৈরি হচ্ছিল।

সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধের আগুন

ঢাকার বাইরেও ১০ জুলাইয়ের এই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের রূপ নেয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা দুপুরের আগেই ষোলশহর রেলস্টেশনে জড়ো হয়ে রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেন। ফলে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী দূরপাল্লার ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি মাঝপথে আটকে পড়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী প্যারিস রোডে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখান, আর রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনের প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দীর্ঘ সময় প্রতীকী অবরোধ করে রাখায় উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

একইভাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুয়াকাটা মহাসড়ক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রংপুরের মডার্ন মোড় অবরোধ করেন। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট, পাবনা এবং হবিগঞ্জের মতো মফস্বল শহরগুলোতেও সাধারণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নেমে আসেন। সারা দেশের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ প্রমাণ করেছিল যে, এই আন্দোলন এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো বিক্ষোভ নয়, বরং এটি সারা বাংলার ছাত্রসমাজের এক দফা দাবিতে রূপ নিয়েছে।

ওবায়দুল কাদেরের হুঙ্কার বনাম সমন্বয়কদের চূড়ান্ত আলটিমেটাম

বিকেলের দিকে আন্দোলনের তীব্রতা যত বাড়ছিল, রাজনৈতিক অঙ্গনেও পারদ ততই চড়ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে কড়া ভাষায় বলেন যে, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং এর ওপর কোনো কথা হতে পারে না। জনগণের চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করে এমন সমস্ত হঠকারী কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।’

তবে সরকারের এই অলস নীতি ও প্রচ্ছন্ন হুমকির উপযুক্ত জবাব আসে সন্ধ্যার পর শাহবাগ মোড়ের সমাপনী সমাবেশ থেকে। সেখানে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, “আমরা কোনো আশ্বাসে আর ঘরে ফিরব না। আমাদের এই আন্দোলনের চূড়ান্ত সমাধান রাজপথেই হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সারা দেশে পুনরায় সড়ক ও রেলপথে সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।”

একই সমাবেশে আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম সরকারের আইনি ধোঁয়াশার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘৯৫ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য নির্বাহী বিভাগের লিখিত প্রতিশ্রুতি চান। নির্বাহী বিভাগ যদি অবিলম্বে আলোচনার মাধ্যমে এই যৌক্তিক সংস্কারের ব্যবস্থা না করে, তবে এই আন্দোলন আরও কঠোর রূপ ধারণ করবে।’

নতুন এক গণঅভ্যুত্থানের পদধ্বনি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছাত্র আন্দোলনের এক গৌরবোজ্জ্বল ও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, প্রতিবারই দেশের ক্রান্তিলগ্নে তরুণ সমাজই বুক পেতে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ জুলাইয়ের এই সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিও ছিল ঠিক তেমনি এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের সূচনা।

আপাতদৃষ্টিতে এটি চাকরিতে কোটা সংস্কারের একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন মনে হলেও, সরকারের একঘেয়েমি এবং দমনপীড়নের নীতির কারণে তা ধীরে ধীরে এক যুগান্তকারী গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। পিচঢালা রাজপথে শিক্ষার্থীদের এই অনড় অবস্থান এবং অধিকার আদায়ের অদম্য স্পৃহা কেবল একটি পরিপত্র রক্ষার লড়াই ছিল না; বরং তা ছিল বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও মেধার মূল্যায়নে এক নতুন যুগের স্বপ্ন বোনার মহালগ্ন, যা পরবর্তী দিনগুলোতে পুরো দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেওয়ার সুপ্ত বারুদ বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

সারাবাংলা/এফএন/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

রাজকীয় স্বাদের ছানার কোপ্তা কারি
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৪

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর