সিরাজগঞ্জ: একসময় সাইরেনের শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। সকাল হলেই হাজারো শ্রমিকের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেত সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল। মিলের ভেতরে যন্ত্রের অবিরাম শব্দ, গুদামে জমা হতো সোনালি আঁশ, আর ট্রাকে ট্রাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশে পাঠানো হতো পাটজাত পণ্য। সেই ব্যস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন নীরব। শ্রমিক নেই, উৎপাদন নেই, নেই কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু, থেমে নেই ব্যয়। বন্ধ মিলের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বছরে যার পরিমাণ আট কোটি টাকারও বেশি।
একদিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে এই মিলকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করা হাজারো শ্রমিক ও তাদের পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও পড়েছে বড় ধরনের সংকটে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬০ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় প্রায় ৭৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নর্দান পিপলস জুট মিল। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কওমী জুট মিল। পরবর্তী সময়ে এটি জাতীয় জুট মিল নামে পরিচিতি লাভ করে।
একসময় এই মিল ছিল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টন কাঁচা পাট সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের পাটজাত পণ্য উৎপাদন করা হতো। এসব পণ্য দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে রফতানি করা হতো। সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো এই মিল।
মিলটিকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। মিল শ্রমিক ছাড়াও পরিবহণ শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার, খাবার হোটেল, বাসা ভাড়া ব্যবসা, পাটচাষি সবাই এই মিলের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
দীর্ঘদিন লাভজনকভাবে চললেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে ফের উৎপাদন শুরু হয়। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। লোকসান ও ব্যবস্থাপনা সংকটের অজুহাতে ২০২০ সালের ১ জুন দ্বিতীয়বারের মতো মিলের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ ২০ বছরের জন্য মিলটি লিজ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। শ্রমিকরাও কাজে ফিরতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০২৪ সালে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে মিলটি ফের অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
বর্তমানে মিলে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম নেই। তবুও নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কাজ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ভবন ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী বছরে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আট কোটিরও বেশি। অথচ এই বিপুল অর্থ ব্যয় করেও উৎপাদন থেকে সরকারের কোনো আয় হচ্ছে না।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মিলের কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ছে। নিয়মিত উৎপাদন না থাকায় মেশিনে মরিচা ধরছে, ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সম্পদের মূল্য কমে যাচ্ছে। মিল বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শ্রমিকদের জীবনে। যাদের শ্রমে একসময় চলত উৎপাদন, আজ তাদের অনেকেই বেকার।
সাবেক শ্রমিক নাসির উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিল চালু থাকাকালে প্রতি সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করতাম। সংসারে কোনো অভাব ছিল না। এখন রিকশা চালিয়ে কোনোমতে পরিবার চালাই। সন্তানদের পড়াশোনা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
আরেক শ্রমিক আলতাফ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘জুট মিলই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। মিল বন্ধ হওয়ার পর কখনো দিনমজুরি, কখনো অন্যের দোকানে কাজ করে জীবন চলছে। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্য জেলায় চলে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিল ফের চালু হলে আগে যারা এখানে কাজ করেছেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া উচিত।’
জাতীয় জুট মিল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি সিরাজগঞ্জের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। মিল বন্ধ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় পাটচাষিরাও। আগে মিলে সরাসরি পাট সরবরাহ করা যেত। এখন কৃষকদের দূরের বাজারে কম দামে পাট বিক্রি করতে হচ্ছে। এ ছাড়া, পরিবহণ ব্যবসা, ছোট দোকান, খাবারের হোটেল, আবাসিক মেস, ভ্যানচালক, রিকশাচালকসহ অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার আয় কমে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একসময় মিল এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় থাকত। এখন পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে নীরবতা। সিরাজগঞ্জ জেলা শ্রমিক দলের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি বিশা শেখ সারাবাংলাকে বলেন, ‘জাতীয় জুট মিল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জেলার অর্থনীতি, পাটচাষি ও হাজারো শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মিলটি চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।’
জাতীয় জুট মিল মজদুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে মিলটি পুনরায় চালু করা। এতে শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় অর্থনীতি সবাই উপকৃত হবে।’
মিল চালু প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাচ্চু সারাবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় শুধু হাজারো শ্রমিকই কর্মহীন হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকার দ্রুত জাতীয় জুট মিল পুনরায় চালু করলে দেশ অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে।’
এদিকে জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সারাবাংলাকে জানান, মিলটি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, নতুন করে মিলটি লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া গেলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল ফের চালুর বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, এর সামাজিক প্রভাবও ব্যাপক। জাতীয় জুট মিল বন্ধ হওয়ার পর বহু পরিবার দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। অনেক শ্রমিক চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অনেকের সন্তান লেখাপড়া ছেড়ে কাজে নেমেছে। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরি করছেন, আবার কেউ কাজের সন্ধানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে গেছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা শুধু আশ্বাসই শুনে আসছেন। বাস্তবে মিল চালুর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব ও বায়োডিগ্রেডেবল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় জুট মিলকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কেবল লিজের আলোচনা বা আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে উৎপাদন ফের চালু করা হোক। তাহলে একদিকে যেমন সরকারের অকার্যকর ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ফের কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে জাতীয় জুট মিলে। এতে নতুন প্রাণ পাবে সিরাজগঞ্জের অর্থনীতি, আর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে হাজারো শ্রমজীবী পরিবার।