Wednesday 22 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি / ভবন নয়, বিমান দুর্ঘটনার নেপথ্যে অন্যকিছু!

মেহেদী হাসান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২১ জুলাই ২০২৬ ২২:১৪ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৩

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ২০২৫ সালের ২১ জুলাই। ঘড়ির কাটায় দুপুর প্রায় সোয়া ১টা। ছুটির পর কেউ বাসায় যাওয়ার জন্য স্কুলের গেইট পেরিয়েছে, কেউ কেউ স্কুলে কোচিং করার জন্য ক্লাসরুমে অবস্থান করছিল, কেউ দোলনায় দোল খাচ্ছিল; আবার কেউ কেউ মায়ের হাতে বানানো টিফিন খেতে বসেছে। কিন্তু, হঠাৎ বিকট এক শব্দ, এর পর নিস্তব্দ সব। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল স্কুলভবন। বাতাসে ভেসে আসতে থাকল কোমলমতি ফুলগুলোর (শিশুরা) দেহ পোড়া গন্ধ। উত্তরার আকাশ ভারী হয়ে উঠল কান্নার শব্দ ও স্কুলে বিধ্বস্ত যুদ্ধ বিমানের জেট ফুয়েলের গন্ধে। ওই দুর্ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ৩৬ প্রাণের অবসান ঘটে।

বিজ্ঞাপন

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির আজ একবছর। এই একবছরেও জানা যায়নি সেখানে বিমান বিধ্বস্তের কারণ। এবিষয়টি এখনো রহস্যঘেরা। যদিও বিমান বিধ্বস্তের পর প্রশ্ন ওঠে- অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ভবন ও সেটির উচ্চতা নিয়ে। তবে ভবনের কারণে মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট এলাকায় ১৫০ ফুট উঁচু ভবনের অনুমতি থাকলেও ১৩২ ফট উঁচু বা তার বেশি উচ্চতার কোনো ভবন সে সময় ছিল না। তাহলে এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে কী রয়েছে।

মাইলস্টোনে দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে স্কুল ভবনটির বৈধতা নিয়ে। সেই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে বিমানবন্দরের আশপাশে উঁচু ভবনগুলো নিয়েও ওঠে নানান প্রশ্ন। বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মতে, ওখানে ভবন না থাকলে এত বড় দুর্ঘটনার বলি হতো না কোমলমতি শিশুদের। তবে এসব ভাবনাকে ম্লান করে দিয়ে নতুন তথ্য জানালেন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মেম্বার (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম।

ভবনের উচ্চতা বিমান বিধ্বস্তের কারণ না জানিয়ে এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘যে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটা কারও কাছেই কাম্য ছিল না। প্রশ্ন আসতে পারে, এই যে দুর্ঘটনা হলো, সেটা কি উঁচু বিল্ডিংয়ের কারণে হয়েছে? যেই উঁচু বিল্ডিংটা ভায়োলেশন ছিল? সম্প্রতি সেখানে একটা ভবনের জন্য আমাদের কাছে থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়েছে। আমাদের কাছে যখন একটা ক্লিয়ারেন্স কেউ চায়, সে কিন্তু ভবন বা স্থাপনার প্রাপ্য উচ্চতা কতটুকু, সেটা আমাদের কাছে দাবি করে এবং একটা ছাড়পত্র চায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখেছি মাইলস্টোনের ওই জায়গাটাতে ১৫০ ফুট পর্যন্ত হচ্ছে অ্যালাওয়েবল উচ্চতা। ওই সময় দুর্ঘটনা ঘটার পর আমরা ও তদন্ত কমিটি সরজমিনে যা দেখেছি, ওখানে ১৩২ থেকে ১৩৭ ফিট উঁচুর তখন বিল্ডিং ছিল না। এখন একটি ১৫০ ফুট উঁচু ভবনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে। কারণ ওখানে ১৫০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতা অনুমোদিত।’

ভবনের অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, আপনি যে অনুমতিটা দিলেন, আবার ওই একই জায়গায় আরেকটা কলেজ বা স্কুল করার অনুমতি দিলেন? এখানে একটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার, সিভিল এভিয়েশনের যে স্কোপ অব ওয়ার্ক আছে, এখানে আমার কাজ হচ্ছে প্রাপ্য উচ্চতাটা কতটুকু, ভবন হোক বা স্থাপনা হোক, সেটার ছাড়পত্র দেওয়া। আমরা ছাড়পত্র দেওয়ার পর বিএনবিসি কোড অনুসরণ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সার্টিফিকেট দিচ্ছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সার্টিফিকেট দিচ্ছে। এসব নেওয়ার পরে নগর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে- সেখানে ওয়্যারহাউজ, নাকি গোডাউন, নাকি ছাত্রাবাস, নাকি স্কুল-কলেজ, অথবা হাসপাতাল করা যাবে। এটা নগর পরিকল্পনাবিদ বা তাদের কাজ।’

ভায়োলেশন করে তৈরি হওয়া ভবনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের আশেপাশে ৬৪২ থেকে ৬৪৫টি ভবন বা স্থাপনা OLS violation হয়েছে। এই তালিকাটা পর্যায়ক্রমে তদন্ত কমিটি ও রাজউকের কাছে আমরা দিয়েছি। এই ঘটনার পর থেকে রাজউক, আমরা ও SOB দু’টো ফেইজে এই ভবনগুলো ফের রিভিউ করছে। আবার রি-অ্যাসেস করছে। এজন্য গত সপ্তাহেও আমরা পাঁচজন লোককে দিয়েছি সিভিল এভিয়েশন থেকে রাজউকের সঙ্গে কাজ করার জন্য। এই কাজটা চলমান।’

সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খানকে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তদারকির অভাবজনিত মানুষের ভুলকে দায়ী করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিমানবন্দর এলাকায় উচ্চতার সীমা লঙ্ঘনকারী অসংখ্য স্থাপনা থাকার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। তিন মাসের মধ্যে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও সেটি প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুপুর ১টা ১৩ মিনিট ১১ সেকেন্ডে। ঠিক সে সময় থেকে শুরু করে মোট পাঁচ বার বিমানটির পজিশন জানতে চাওয়া হলেও পাইলটের কোনো প্রত্যুত্তর আসেনি। দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে অফিসার কমান্ডিং কর্তৃক জানানো হয় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।

যে কারণে বিধ্বস্ত হলো যুদ্ধবিমানটি

এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান চলাকালে ইঞ্জিনের অবস্থা, হাইড্রলিক সিস্টেম ও কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে কোনো ওয়ার্নিং সিগন্যাল পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিমানটি বেইজ থেকে ফাইনালে বাঁক নেওয়ার সময় মাত্র চার সেকেন্ডের ব্যবধানে ব্যাংক অ্যাঙ্গেল ৫৯ ডিগ্রি থেকে ৬৫.৩ ডিগ্রিতে বৃদ্ধি পায়। তখন পাইলট কন্ট্রোল স্টিকে জোরালো টান দেওয়ার ফলে বিমানটির অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়ে ২৩ দশমিক ২০ থেকে ২৭ দশমিক ৩০ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। যা বিমানটির ক্রিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক ২৪ ডিগ্রির বেশি। ক্রিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক অতিক্রান্ত হওয়ায় বিমানটি স্টলড কন্ডিশনে চলে যায়। পরে পাইলট চেষ্টা করেও ব্যাংক অ্যাঙ্গেল কমিয়ে বিমানটিকে আর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। ফলে ক্রমাগত উচ্চতা হারিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

বিমানটি উড্ডয়নের তথ্যে গড়মিল ছিল

বিমানটি সকালেও একবার উড্ডয়নের পর ফের নিরাপদে অবতরণ করেছিল। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় উড্ডয়নের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। তথ্যে কিছু গড়মিল বা অসামঞ্জস্যের বিষয় প্রতিবেদনে উঠে আসে। কমান্ডিং অফিসার মোবাইল ভ্যান থেকে পাইলটকে পুনরায় ইনিশিয়াল এ আসার নির্দেশ দেন, যা ফার্স্ট সলো ফ্লাইটের মিশন প্রোফাইলের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার পর্যাপ্ত সুপারভিশনের অভাবে পাইলট উড্ডয়নের সময় যথাযথ উড্ডয়ন প্যারামিটারগুলো বজায় রাখতে পারেনি। ফলে পাইলটের যথোপযুক্ত প্রতিক্রিয়ার অভাবে বিমানটি হঠাৎ স্টলড কন্ডিশনে চলে যায়। তবে পরিবেশগত নিয়ামক হিসেবে পাখি বা অন্য কোনো উড্ডীয়মান বস্তু কর্তৃক বিমানের উইন্ড-শিল্ডে আঘাতও এই ঘটনায় পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ফ্লাইংজোন এলাকায় কোনো স্কুল কলেজ ও হাসপাতাল থাকার নিয়ম নাই। যে ভবনে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে রাজউক সেটি ভেঙে ফেলার জন্য তিনবার নোটিশ দিয়েছিল। ওই ভবনটি অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। আর সিভিল এভিয়েশন যে ১৫০ ফুট উচ্চতার কথা বলছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়।’

এদিকে, একবছর পেরিয়ে গেলেও দুর্ঘটনায় আহত অনেক শিক্ষার্থী এখনো মানসিক ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি। স্বজনদের ভাষ্য, আকাশে বিমানের শব্দ শুনলেই অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, কেউ কান চেপে ধরে, আবার কেউ মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে কান্না করে। অনেকের মধ্যে খিটখিটে আচরণ দেখা যায়।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা সৃষ্টি করে। কেবল শারীরিক চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পুনর্বাসন, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক সহায়তা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

আরো

মেহেদী হাসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর