Thursday 23 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি, দেশজুড়ে কারফিউ শিথিল

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:১৫ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ ০৯:৪১

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঘটনাবহুল একটি দিন। সারাদেশ যখন টানা ষষ্ঠ দিনের মতো ইন্টারনেটহীন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থমকে আছে, ঠিক তখনই রাজপথের দাবির মুখে আসে সরকারি সিদ্ধান্তের বড় ঘোষণা। একদিকে আদালতের নির্দেশনা মেনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি, অন্যদিকে জনজীবনের চরম ভোগান্তি কমাতে রাতে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা ফের চালুর উদ্যোগ। স্বস্তি ও শঙ্কার এক অভূতপূর্ব দোলাচলে পুরো দেশ তখন এক অনিশ্চিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল।

মেধা ও কোটার নতুন বিন্যাস

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ আন্দোলন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর এই দিনেই কোটা সংস্কার নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বহুল প্রত্যাশিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনার আলোকে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বশাসিত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন করপোরেশনের ৯ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ পদের জন্য কোটা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়, যার মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ বরাদ্দ থাকে। এই সংশোধিত বিধানে আরও পরিষ্কার করা হয় যে, নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সাধারণ মেধাতালিকা থেকেই সেসব শূন্য পদ পূরণ করা হবে।

আংশিক সচল জনজীবন

দেশজুড়ে জারি থাকা কঠোর সান্ধ্য আইনের মেয়াদ কিছুটা শিথিল করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আসে এই ২৩ জুলাইয়ে। টানা তিন দিনের সাধারণ ছুটি শেষে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে পরবর্তী দিন অর্থাৎ ২৪ জুলাই থেকে সকাল ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত চার ঘণ্টার জন্য সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন সচল রাখতে রফতানিমুখী গার্মেন্টস কারখানাগুলোও ২৪ জুলাই থেকে সীমিতভাবে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।

ঢাকার সাথে বাইরের যোগাযোগের জন্য মহাসড়কগুলোতে দূরপাল্লার বাস এবং নৌপথে আন্তঃজেলা লঞ্চ চলাচল সীমিত পরিসরে আবার শুরু হয়। দীর্ঘ নীরবতার পর রাতে কেবল জরুরি সেবা, গণমাধ্যম ও নির্দিষ্ট আর্থিক খাতের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড সেবা সচল হলে যেন থমকে থাকা নাগরিক জীবনে নিঃশ্বাস ফেলার কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়।

চিরুনি অভিযান ও রাজপথের উত্তেজনা

প্রশাসনিক শিথিলতা দেখা গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে কোনো ঘাটতি ছিল না। বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার অভিযোগে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রাখে যৌথবাহিনী। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সারাদেশে ১ হাজার ১০০ জন মানুষকে আটক করা হয়, যার মধ্যে এককভাবে রাজধানী ঢাকা থেকেই ৫১৭ জনকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। ১৭ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সারাদেশে মোট গ্রেফতারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং এই একদিনেই দেশের বিভিন্ন থানায় আরও ৩৮টি নতুন মামলা লিপিবদ্ধ হয়। সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এই ধরপাকড় নিয়ে এক তীব্র উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।

৪ দফা দাবি ও ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা

রাজপথ থেকে আন্দোলনকারীরাও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে এই দিনে চার দফা জরুরি দাবি পেশ করা হয়। সারাদেশে পুরোপুরি ইন্টারনেট ফের চালু, দেশব্যাপী বহাল থাকা সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার, শিক্ষার্থীদের নিরাপদে আবাসন সুবিধা ফিরিয়ে দিতে হলগুলো খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের শর্ত দেওয়া হয়। এই দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি ৪৮ ঘণ্টার একটি আলটিমেটাম বেঁধে দেওয়া হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক বার্তা দেন যে, সরকার আন্তরিকতা দেখালে তারা আলোচনার টেবিলে বসতে এবং সমস্যার সুরাহা করতে প্রস্তুত।

নিখোঁজ ছাত্রনেতা ও প্রশাসনের দ্বিধা

১৮ জুলাই থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শীর্ষ তিন ছাত্রনেতার সন্ধান না পাওয়ায় সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রধানের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, আন্দোলনে সাধারণ বা নিরীহ কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে। কিন্তু একই দিনে এলিট ফোর্স র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তা স্পষ্ট জানান যে, সহিংসতার নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর হল খোলার কথা বলা হলেও নিখোঁজ সমন্বয়কদের অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানসিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর