ঢাকা: ৩০ জুলাই সকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে যায়, তখন পুরো চিত্রটি এক নিমেষে বদলে যায়। রাষ্ট্র আদেশ দিয়েছিল কালো ব্যাজ ধারণ করার, কিন্তু বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেই শোককে সরকারি তামাশা আখ্যা দিয়ে একযোগে প্রত্যাখ্যান করে।
আন্দোলনকারীদের ডাকে সাড়া দিয়ে ২৯ জুলাই গভীর রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল দুনিয়া ভেসে যায় লাল রঙের জোয়ারে। সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, আইনজীবী এবং লাখো নাগরিক নিজেদের ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমের ছবি বদলে পুরোপুরি লাল করে দেন। ৩০ জুলাই ভার্চুয়াল প্রাচীর ছাপিয়ে বাস্তবের রাজপথেও নেমে আসে সেই লালের আগুন। মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে রাস্তায় নেমে আসেন বিক্ষুব্ধ তরুণরা। রাষ্ট্রীয় উপহাসের বিরুদ্ধে লাল রঙই হয়ে ওঠে নিপীড়নবিরোধী দ্রোহের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
রাজপথের গর্জন ও অবরুদ্ধ প্রতিবাদ
সরকারের দমন-পীড়ন আর কারফিউর থমথমে পরিবেশের মাঝেই ঢাকার পথে পথে শুরু হয় অসম প্রতিরোধ। পল্টন, সায়েন্সল্যাব, সেগুনবাগিচা আর মিরপুরে শিক্ষার্থীরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে মোড়ে মোড়ে সতর্ক অবস্থানে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে লাঠিচার্জ ও ধাওয়া দিয়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
একই দিনে ঢাকা মেডিকেলের সামনে স্বজনহারা অভিভাবকরা যখন বিচারের দাবিতে বুকচাপড়ে দাঁড়াচ্ছিলেন, তখনও পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয়। গুলিস্তানে গণসংগীতের সুরে প্রতিবাদ জানাতে গেলে সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের তুমুল ধাক্কাধাক্কি বাঁধে। অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল বের করে সহকর্মীদের হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও রাষ্ট্রীয় চাপ
দেশের ভেতরে চরম উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয় নজিরবিহীন চাপ। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ‘দেখামাত্র গুলি’র কঠোর নির্দেশের বিরুদ্ধে কড়া বিবৃতি দেওয়া হয়।
চারপাশের এই কূটনৈতিক ও সামাজিক তোপের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাধ্য হয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাহায্য নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা বলেন। কিন্তু রাজপথে তখন পুলিশি গ্রেফতার ও হামলা অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষ এই বক্তব্যকে সরকারের চরম দ্বিচারিতা হিসেবেই গ্রহণ করে।
ছয় সমন্বয়ক আটক ও আল্টিমেটামের ঝড়
ঢাকার বিভিন্ন থানায় ততক্ষণে ২৬৪টির বেশি মামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আর পুরো দেশে গ্রেফতারের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১০ হাজার। ডিবি কার্যালয়ে আন্দোলনের প্রধান ছয় সমন্বয়ককে জিম্মি করে রাখার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ ফেটে পড়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছয় সমন্বয়কসহ নিরপরাধ আটক সবাইকে মুক্তি না দিলে আরও কঠিন কর্মসূচির মুখোমুখি হতে হবে প্রশাসনকে।
মধ্যরাতের টেলিগ্রাম বার্তা ও নতুন ইতিহাস
৩০ জুলাই রাত সোয়া ১১টায় ঘটে মূল মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাটি। টেলিগ্রামের গোপন বার্তা কক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল কাদের এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় পরবর্তী কর্মসূচির মূল ফ্রন্টলাইন ঘোষণা করেন- ‘মার্চ ফর জাস্টিস’।
৩১ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টায় দেশের সব আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজপথ দখলের নির্দেশ দেওয়া হয়। গণগ্রেফতার, গুম ও নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের বিচারে জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের দাবিতে আসা এই একক ঘোষণাই ৩০ জুলাইয়ের রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পরদিনের এক মহাবিস্ফোরণের পটভূমি রচনা করে।