Saturday 01 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / মুখ চেপেও থামেনি স্লোগান, ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি ঘোষণা

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৩১ জুলাই ২০২৬ ০৮:১১ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ ১০:১৫

ঢাকা: ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই। জুলাই আন্দোলনের ক্যালেন্ডারে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, নাগরিক প্রতিরোধ এবং অদম্য সাহসের এক স্মারক। রাজধানীর রাজপথ থেকে আদালতপাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে জেলা শহর—দেশজুড়ে সেদিন একই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছিল- ন্যায়বিচারের দাবি কি বলপ্রয়োগে থামিয়ে দেওয়া যায়?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে। কিন্তু দিনের শেষে রাজপথ ভরে ওঠে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায়, সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে, গ্রেফতার আর রক্তাক্ত মানুষের আর্তনাদে। তবু থামেনি প্রতিবাদ। বরং পরদিন সেই ক্ষতই রূপ নেয় ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচিতে।

বিজ্ঞাপন

এক ডাকে গর্জে উঠল দেশ

আগের রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছিল কর্মসূচির আহ্বান। নয় দফা দাবিতে সমন্বয়কদের ডাকা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এ অংশ নিতে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ। দুপুরের আগেই রাজধানীর হাইকোর্ট মাজার গেট এলাকায় মানুষের ঢল নামে। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। কালো গাউন পরে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন আইনজীবীরাও। স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা। কিন্তু বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়লে মুহূর্তেই কর্মসূচির পরিবেশ সংঘর্ষে রূপ নেয়। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা।

কাঁদুনে গ্যাসে আড়ালে দমন-পীড়ন

রাজধানীর রাজপথ সেদিন তরুণ রক্তের সাক্ষী ছিল। দোয়েল চত্বর, শহিদ মিনার কিংবা সুপ্রিম কোর্টের আশপাশ—কোথাও নিস্তার ছিল না মানুষের। ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে বুটের লাথি আর ধাক্কা সহ্য করতে হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। ধোঁয়া আর কাঁদানে গ্যাসের মধ্য দিয়ে সেদিন পুলিশি তাণ্ডব আছড়ে পড়েছিল নির্বিচারে। সারা দেশে কেবল একদিনেই রক্তাক্ত হয়েছিলেন প্রায় নব্বই জন স্বাধীনচেতা মানুষ, যাঁদের মধ্যে বাদ যাননি ঘটনার ছবি তুলতে যাওয়া সাংবাদিকরাও। সাড়ে তিনশরও বেশি মানুষকে সেদিন বন্দি করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়, যা চৌদ্দ দিনের গণগ্রেফতারকে নিয়ে যায় দশ হাজারের গণ্ডি পার করে।

ভাইয়ের বেল্ট আঁকড়ে বোনের আর্তনাদ

সেদিনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ইতিহাস হয়ে থাকা দৃশ্যটি রচিত হয়েছিল হাইকোর্ট মাজার গেটে। রাজপথের আন্দোলন থেকে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নূর হাসানকে যখন জোর করে প্রিজন ভ্যানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল সশস্ত্র পুলিশ, ঠিক তখন ধেয়ে এসেছিলেন তাঁর বোন নুসরাত জাহান। পুলিশের টানাটানির মুখেও ভাইয়ের কোমর থেকে বেল্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন বোন। আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে বলেছিলেন, প্রয়োজনে তাঁর ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিতে, তবুও যেন ভাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এমনকি চলন্ত প্রিজন ভ্যানের পথ আটকে একা দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন সেই বোন। চোখের সামনে ভাই হারানোর সেই আকুতি আর অসীম সাহসের দৃশ্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশকে।

মুখ চেপে ধরে পুলিশ, তবুও থামেনি প্রতিবাদ

সেই একই দুপুরে হাইকোর্টের ঈদগাহ গেটের সামনে ফুটে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে নগ্ন চেহারা। পুলিশের বাধার মুখেও যখন নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম বুক চিতিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ পেছন থেকে এসে তাঁর মুখ শক্ত হাতে চেপে ধরেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। বাতাসের মতো মুক্ত যে কণ্ঠস্বর ন্যায়বিচার চেয়েছিল, তাকে এক নির্মম হস্তক্ষেপে রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মুখ চেপে ধরলেও নাহিদুলের চোখের সেই আগুন আর নির্ভীক চাহনি আটকে রাখা যায়নি। সেই ছবি মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে মানুষের মনে ক্ষোভের এক দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

রাজধানী পেরিয়ে সারা দেশে গণপ্রতিরোধের আগুন

ঢাকার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল স্বৈরাচারবিরোধী গর্জন। সিলেট ও খুলনায় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীরা যখন সামনের দিকে এগোতে চেয়েছে, তখন তাদের ওপর আছড়ে পড়েছে ছররা গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেড। চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে রাজশাহীর মহাসড়ক, সবখানেই পুলিশি ব্যারিকেড আর সাশ্রু গ্যাসের ধোঁয়া উড়িয়ে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। এমনকি পুলিশ যখন মারমুখী মেজাজে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীরা ভালোবাসা আর প্রতিবাদের অভিনব মিশেলে পুলিশদের হাতে আইসক্রিম তুলে দিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখার আহ্বান জানিয়েছিল।

কূটনৈতিক টানাপড়েন ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাতে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলও। গণগ্রেপ্তার, বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, পশ্চিমা দেশ ও কূটনৈতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে। সরকারও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।

রাজপথের এই গণজাগরণ কাঁপিয়ে দিয়েছিল সরকারের ভিত্তি। গণভবনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন শাসক শেখ হাসিনা বিদেশি রাষ্ট্রদূতের কাছে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ তুলে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আর চোখ বুজে ছিল না। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা গণগ্রেফতার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা পাঠাতে শুরু করে। ভেতরের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, শাসকদলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি গোপনে দেশ ছাড়তে শুরু করে।

‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’: স্মৃতি ফেরাতে দেয়াল লিখন

রক্তাক্ত ৩১ জুলাই পেরিয়ে যখন নতুন দিন এল, তখন আন্দোলন থামেনি, বরং তা রূপ নিল ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচিতে। ১ আগস্ট শহরের আনাচে-কানাচে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের দেয়ালে ফুটে উঠতে শুরু করল প্রতিরোধের নতুন ছবি ও গ্রাফিতি। লাল রঙের ডিজিটাল ক্যানভাস পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা রাজপথের শক্ত দেয়ালে এঁকে দিল রক্তে ভেসে যাওয়া সহপাঠীদের মুখ, আর লিখে রাখল সেই অমোঘ বাণী ‘আমরা ভুলব না, আমরা ভুলতে পারি না।’

ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ষরে লেখা দিন

১ জুলাইয়ের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে, বলপ্রয়োগ দিয়ে প্রতিবাদ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা গেলেও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে রাখা যায় না। ডিজিটাল মাধ্যমে রক্তিম লাল রঙের যে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল, তা পরবর্তীতে বাস্তবে এনেছিল এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। পুলিশের লাঠি, সাউন্ড গ্রেনেড আর প্রিজন ভ্যানের হিংস্রতার সামনে সেদিন দাঁড়িয়ে যাওয়া তরুণেরাই প্রমাণ করেছিল ‘শৃঙ্খল ভাঙার গান কখনো থামানো যায় না। ’ সেই ভয়াল ও বীরত্বপূর্ণ ৩১ জুলাইয়ের পথ ধরেই ত্বরান্বিত হয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

সারাবাংলা/এফএন/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর