ঢাকা: গণতন্ত্রকে টেকসই করতে গণমাধ্যমকে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারকে কাজ করার জন্য সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তিনি বলেছেন, সরকারকে সবসময় চোখে চোখে রাখতে হবে, ভুল করলে তা তুলে ধরতে হবে; তবে একই সঙ্গে সরকারকে সময়ও দিতে হবে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, গণমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরা নয়, সরকারের অর্জন ও সাফল্য নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কোনো কোনো টেলিভিশন টকশোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একটি অনুষ্ঠানে সরকারের ‘চার মাসের ব্যর্থতা’কে শিরোনাম করা হচ্ছে। এতে মনে হয়, সরকার যেন চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারের চার মাসের অর্জন বা সাফল্য নিয়ে একইভাবে আলোচনা হচ্ছে না। গণমাধ্যমের এমন একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও টেকসই করতে হলে গণমাধ্যমকে নিজের জায়গায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মালিক ও সাংবাদিকদের মধ্যে সুস্থ সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম যদি শর্তহীনভাবে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে গণতন্ত্রও শক্তিশালী হবে। তবে এ জন্য শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; গণমাধ্যমের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোকেও শক্তিশালী করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। মুহূর্তের মধ্যে একটি ছোট পোস্ট বা প্রচারণা একজন মানুষের সারা জীবনের অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার খুব অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু ঠিক করে ফেলবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। কারণ বর্তমান সরকার একটি পরিবর্তনকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। এই সময়ে সবাইকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, তখনই অনেক ক্ষেত্রে ‘ধ্বংসস্তূপ’ পায়। বর্তমান সরকারও গ্যাস, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের সরকারগুলো দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি। বরং আমদানিনির্ভর একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। একইভাবে বিদ্যুৎ খাতে কুইক রেন্টাল প্রকল্পের মাধ্যমে বড় ধরনের সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যাংক খাতের প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ব্যাংকগুলোকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে সেগুলো পুনর্গঠন ও ঠিক করতে সরকারকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অস্থির হলে চলবে না। ধৈর্য রাখতে হবে, সহনশীলতা রাখতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রকে কখনোই এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
সরকার, গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের মালিক—সব পক্ষকেই ধৈর্য ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশকে টেকসই গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, তারেক রহমান যেভাবে চিন্তাভাবনা করছেন এবং কাজ করছেন, সবাই যদি সময় নিয়ে ধৈর্য ধরে তার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে দেশকে এমন একটি পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে, যেখানে গণতন্ত্র একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক আবদুল হাই সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। আরও বক্তব্য দেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান, প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, একাত্তর টিভির সিওও শফিক আহমেদ, মোহনা টিভির হেড অব নিউজ রাশেদুল হক, বিএফইউজের যুগ্ম-মহাসচিব এরফানুল হক নাহিদ, ইনডিপেন্ডেন্ট টিভির মোস্তফা আকমল প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন গাজী টিভির হেড অব নিউজ গাউসুল আজম বিপু।