ঢাকা: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ আলমগীর পাভেল।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিয়ানমার সরকার এবং প্রয়োজন হলে আরাকান আর্মির সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে।’
শনিবার (২৯ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহিতা, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের প্রত্যয়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
মওদুদ আলমগীর পাভেল বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর তাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং এখন তাদের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রত্যাবাসনের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার বিষয়টি সামনে আসে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মিয়ানমারের সামগ্রিক ভূখণ্ডের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। রাখাইন রাজ্যের বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা শুধু মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে করলেই সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার আওতায় আনতে হবে।’
পাভেল বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর বিষয়টি শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না; এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। মিয়ানমারে চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ রয়েছে। কিয়াউকফিউ বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে চীনের স্বার্থের পাশাপাশি ভারতের কালাদান প্রকল্প ও সিত্তে বন্দরকে ঘিরেও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়াকে দেশটির পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তরুণ ও কর্মক্ষম অংশকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা গেলে তাদের পুনর্বাসন শুধু মানবিক সমাধানই নয়, মিয়ানমারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।’
এ সময় তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘শুধু একটি জাতীয় কমিটি গঠন করলেই হবে না। প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে রোহিঙ্গাদের বোঝা বহন করতে চায় না; তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই সমাধান।’
সেমিনারে গুমের বিচার প্রসঙ্গেও কথা বলেন মওদুদ আলমগীর পাভেল। তিনি বলেন, ‘গুম একটি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। একটি মানুষ গুম হলে শুধু ওই ব্যক্তি নন, তার পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকে। স্বামী বেঁচে আছেন কি না, স্ত্রী বিধবা কি না কিংবা সন্তান তার বাবার মৃত্যুর পর ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারগুলো কীভাবে পালন করবে— এসব প্রশ্নের কোনো সুরাহা থাকে না।’
তিনি বলেন, ‘গুমের তদন্ত অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ যদি অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে তাদের দিয়ে তদন্ত করানো হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই গুমের তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’
পাভেল বলেন, ‘মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডিউটি প্রোফাইল, রেজিস্টার, নথিপত্র ও চলাচলের তথ্যসহ সব ধরনের আলামত একত্র করে তদন্ত করতে হবে। প্রচলিত দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা দিয়ে গুমের মতো জটিল অপরাধের যথাযথ তদন্ত করা কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গুমের শিকার ব্যক্তি একমাত্র ভিকটিম নন; তার পরিবারও এই অপরাধের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার। তাই আইনি কাঠামোয় ভুক্তভোগী পরিবারের বিষয়টিও যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।’
সেমিনারে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, মেজর (অব.) ওহাব এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহ এনাম খান-সহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
বক্তারা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।