ঢাকা: চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে ইজারা দিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-সিসিটি ইজারা: বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
বন্দর রক্ষা ও করিডোর বিরোধী আন্দোলন এবং বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশিদের হাতে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রুহিন হোসেন প্রিন্স আরও বলেন, ‘বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের প্রধান বন্দরের দায়িত্ব তুলে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অনুষ্ঠিত লংমার্চে বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ অংশ নেওয়ায় প্রমাণিত হয় যে বন্দর রক্ষা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিদেশি শক্তির আনুগত্য করলে দেশের জনগণ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।’ তিনি সরকারকে অবিলম্বে এই চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও প্রধান প্রবেশদ্বার। এনসিটি ও সিসিটি দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় দক্ষ কর্মকর্তা ও শ্রমিক দিয়ে সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই অবস্থায় দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কোনো যুক্তি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে আমদানি ও রফতানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে শিল্প খাত এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দরের আয় এবং অর্থপ্রবাহের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।’
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ সভায় বলেন, ‘নিউমুরিং টার্মিনালের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন করে বড় ধরনের আধুনিকায়ন করার সুযোগ নেই। বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই দীর্ঘদিন বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব। বিদেশি অপারেটর এলেই বন্দরের সক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।’
চট্টগ্রাম সিবিএর সাধারণ সম্পাদক নুরুল্লাহ বাহার বলেন, ‘এনসিটি বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে দেশীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ট্রেড ইউনিয়ন চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত বলেন, ‘কৌশলগত জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির স্নায়ুমুখ এবং দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্তমান বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর এবং চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেকোনো চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’
আলোচনা সভার সভাপতির বক্তব্যে বন্দর রক্ষা ও করিডোর বিরোধী আন্দোলনের আহ্বায়ক এম এ সাঈদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে প্রধান বিবেচনা হিসেবে রাখতে হবে।’
ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজার পরিচালনায় এই আলোচনা সভায় বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।