Tuesday 30 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গরুর চেয়ে দালাল বেশি / উত্তরাঞ্চলের হাটগুলোতে ২৩৪ কোটি টাকার নীরব চাঁদাবাজি!

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৭ মে ২০২৬ ১৮:৩৪ | আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ২২:১৫

উত্তরাঞ্চলের হাটগুলোতে হাসিলের নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। যেটাকে নীরব চাঁদাবাজি বলছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

রংপুর: আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উত্তরাঞ্চলের কোরবানির হাটগুলোতে চলছে চাঁদাবাজির মহানৈরাজ্য। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আদায় করছে ইজারাদার সিন্ডিকেট। আর প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এ বছর আত্মসাতের শঙ্কা ২৩৪ কোটি টাকা। সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভাষ্যে, ‘হাটে গরুর চেয়ে দালাল বেশি’।

আর্থিক হিসাবে যত লুট

উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদার তুলনায় যোগান অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের যোগসাজশে ইজারাদার সিন্ডিকেট বিপুল সংখ্যক পশুর বিপরীতে প্রায় ২৩৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিবে, যা সরাসরি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি। প্রতিটি পশুতে গড়ে ৭০০ টাকা করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে, যার অধিকাংশের কোনো রশিদ নেই।

বিজ্ঞাপন

দ্বিগুণ টোল, নেই রশিদ

সরকারি বিধি অনুযায়ী, কোরবানির হাটে ক্রেতার কাছ থেকে সর্বোচ্চ বড় গরুর জন্য ৮০০ টাকা এবং ছোট পশুর জন্য ৬০০ টাকা হাসিল নেওয়ার নিয়ম। ছাগলের জন্য এই হার সর্বোচ্চ ২২০ টাকা। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের হাটগুলোতে ইজারাদারদের লোকজন জোরপূর্বক ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।

শুধু তাই নয়, সরকারি বিধিতে বিক্রেতার কাছ থেকে হাসিল আদায়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু অধিকাংশ হাটেই ইজারাদারেরা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই আলাদাভাবে হাসিল আদায় করছেন। বিক্রেতাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নেওয়া হচ্ছে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ একটি গরু লেনদেন করতে গেলে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে মিলিয়ে ১৫০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত টাকা আদায়ের পরও ইজারাদাররা সরকারি রশিদ দিতে রাজি নন। কোথাও সাদা কাগজে নামমাত্র স্লিপ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও কোনো কাগজই দেওয়া হচ্ছে না।

‘গরুর চেয়েও দালাল বেশি’

হাসিল নৈরাজ্যের পাশাপাশি হাটগুলোতে দালালের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। রংপুর বিভাগের বেশ কয়েকটি বড় হাটে পরিস্থিতি এমন যে, সাধারণ ক্রেতা পশুর মালিকের কাছে সরাসরি গিয়ে দরদাম করতে পারেন না। দালালরা পশুর মালিকের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে গরু চুক্তিতে নিয়ে ক্রেতার কাছে অস্বাভাবিক দাম হাঁকাচ্ছেন। প্রান্তিক বিক্রেতারা দালালের ভয়ে সরাসরি পশু বিক্রি করতে পারছেন না।

সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রাণিসম্পদ পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ও উৎপাদক এবং ভোক্তাদের মধ্যে মূল্যের পার্থক্য বিশ্লেষণ’ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রান্তিক খামারিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় ন্যায্যমূল্য পান না; পশু পরিবহণে খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে ভোক্তাদের অতিরিক্ত মূল্য গুণতে হয়। পশু পরিবহণ পথেও চাঁদাবাজি একটি বড় সমস্যা।

সরেজমিন প্রতিবেদন: লালবাগ হাটের চিত্র

ঐতিহ্যবাহী লালবাগ হাটে সরেজমিনে জানা যায়, প্রতিটি গরু কেনাবেচায় ১ হাজার ৪০০ টাকা হারে হাসিল আদায় করেছেন ইজারাদারের লোকজন। এর মধ্যে ক্রেতার কাছ থেকে ১ হাজার ২০০ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে আরও ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছাগল কেনাবেচায় ক্রেতার কাছ থেকে ৫০০ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ করে মোট ৭০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। রসিদে হাসিল আদায়ের কোনো টাকার অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের ক্ষোভ

পীরগঞ্জের আলী হাসান ৯৫ হাজার টাকায় একটি ষাঁড় কিনে ১২০০ টাকা হাসিল দিতে বাধ্য হন। বিক্রেতা শামিম হোসেনকেও দিতে হয়েছে ২০০ টাকা। নগরীর মাসুদুর রহমানের অভিযোগ, ‘৮৫ হাজার টাকার ষাঁড়ের জন্য দিতে হয়েছে ১২০০ টাকা। কোনো রশিদ নেই।’ আরেক ক্রেতা হোসেন মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এ হাটে চলছে ইজারাদারের প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। কেউ দেখার নেই।’

ইজারাদারের স্বীকারোক্তি

লালবাগ হাটের ইজারাদার আশরাফুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষ্যে একটু বেশি হারে হাসিল আদায় করা হচ্ছে। সব হাটেই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই হাসিল আদায় করা হয়। অন্যরা আদায় করছে, আমিও করি।’

কেন এই নৈরাজ্য?

জেলা প্রশাসন মাঠে ভিজিল্যান্স টিম ও মোবাইল কোর্ট পাঠালেও তা অকার্যকর বলে অভিযোগ। বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের কিছু সদস্যের সঙ্গে ইজারাদার সিন্ডিকেটের ‘বিশেষ সখ্যতা’ আছে বলেই প্রশাসনিক চোখের সামনে এত বড় অনিয়ম সম্ভব হচ্ছে। কোরবানির পশুর হাট ইজারা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়।

এ ছাড়া, পশুর গায়ে কৃত্রিম টনিক প্রয়োগের মতো প্রতারণাও বেড়েছে, যা ক্রেতার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অথচ পশু পরিবহণে আরও কিছু চক্র চাঁদাবাজি করে, যা এই শৃঙ্খলার অভাবকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি হাসিল আদায়ের সুযোগ নেই। কিছু ইজারাদারকে এরই মধ্যে জরিমানা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে বিশ্লেষক ও সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতারা মনে করছেন, সাময়িক জরিমানা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সময়মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা না নিলে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হবেন এবং সরকারি রাজস্ব খোয়া যাবে।

বাংলাদেশের পশুর হাটগুলোতে এই আইনহীনতা কোরবানির আনন্দই মাটি করছে না, বরং দেশের অর্থনীতিতে একটি কালো অধ্যায় রচনা করছে। ঈদ-উল-আজহার আগে দালাল ও ইজারাদার সিন্ডিকেটের এই চক্রান্ত বন্ধ করতে জনপ্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর