Wednesday 05 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

শহিদ আবু সাঈদের সেই ছবিই হাসিনা পতনের কফিনের শেষ পেরেক

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৪৩

জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহিদ আবু সাঈদ। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সেই ছবি, যা গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছিল। স্বৈরাচার পতনের দুই বছর পার হলেও রংপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাস আজও অসমাপ্ত। পুলিশের গুলিতে নিহত শহিদের পরিবার এখনও বিচারের অপেক্ষায়। অস্ত্রধারী হামলাকারী ও গুলি চালানো পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এখনও চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ। অথচ গণঅভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোতে সাধারণ মানুষ কীভাবে রাজপথে নেমেছিল, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে কীভাবে পঞ্চমুখী হয়েছিল রংপুরের আকাশ, তা আজও ইতিহাসের পাতায় অমলিন।

আবু সাঈদের মৃত্যু থেকে গণঅভ্যুত্থানের পথে

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন আবু সাঈদ। পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে দেওয়া সেই দৃশ্য দেশবিদেশে আলোড়ন তোলে। এই আত্মত্যাগের আগুনে পুড়ে যায় গোটা দেশ। এর মাত্র ১৮ দিন পর ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে ‘এক দফা’ দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক আসে। রংপুরেও বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক-সহ সর্বস্তরের মানুষ প্লাবিত করেন রাজপথ। সেই বাঁধভাঙা জনজোয়ার পরবর্তী ৪ ও ৫ আগস্টের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।

দুই বছরে নিষ্পেষিত ৬ মামলা

আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯ জুলাই রংপুরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের গুলিতে প্রাণ হারান সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন, ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম ও শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ-আল তাহির। তবে নিহতদের পরিবারের মূল ক্ষোভ ও বাস্তবতা হলো- দুই বছরেও এই ছয়টি হত্যা মামলার একটিও চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ। ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, চিহ্নিত হয়নি গুলি চালানো পুলিশ সদস্যরা।

‘নতুন বিপদ সংকেত’: আহত ও স্বজনদের বেদনাবিধুর কণ্ঠ

সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন শতাধিক। পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী পুলিশের গুলিতে পা হারিয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ওই দিন পুলিশ আমার চেম্বারের সাটার ভেঙে গুলি ছুড়েছিল। বাম পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। আমি চাই, ফ্যাসিস্ট শাসনের সেই দিন আর ফিরে না আসে।’

শহিদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিটি বাজারের সামনে পুলিশের গুলিতে স্বামী মারা যান। দু’টি সন্তান নিয়ে লড়াই করছি। সরকারি ভাতা দিয়ে সংসার চলে না। ইউনূস সরকার বিচার করবে ভেবেছিলাম, কিন্তু তদন্তে অগ্রগতি না দেখে মনে হয় স্বামীর বিচার পাব না।’

শহিদ সাজ্জাদের মা ময়না বেগম বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘মামলা করেছি, দুই বছর পেরিয়ে গেল। বড় বড় আসামিদের ধরল না পুলিশ। আমার সাজ্জাদের মৃত্যুর বিচার হলে মরেও শান্তি পাব।’

রক্তপাতের দিনপঞ্জি: ১৯ জুলাই ও ৪ আগস্টের ঘটনা

১৮ জুলাই মডার্ন মোড়ে পুলিশের গুলিতে অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া নিহত হলে উত্তেজনা ছড়ায়। ওইদিন ছাত্র-জনতা আওয়ামী লীগ অফিস, ডিবি কার্যালয়ে আগুন দেয়। পরদিন ১৯ জুলাই বিএনপির মিছিলে যোগ দেয় হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। গ্র্যান্ড হোটেল মোড় থেকে সিটি করপোরেশনের দিকে এগোতে থাকা মিছিলে পুলিশ রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়লে সংঘর্ষ বাঁধে।

৪ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন। সকাল থেকে টাউন হল চত্বরে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা পিস্তল, লাঠি, লোহার পাইপ নিয়ে জাহাজ কোম্পানি মোড়ে অবস্থান নেন। দুপুরে সংঘর্ষ শুরু হলে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। কাউন্সিলর হারাধন রায় হারাসহ কয়েকজন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সংঘর্ষে হারাধন রায়, খসরু, সবুজ, মুন্না-সহ পাঁচজন নিহত হন। এই দিনটিতেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে উপজেলাগুলোতে, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটে বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগাছায়।

বিচার বাণিজ্য ও নীরবতা: ২৬৩৬ আসামি কিন্তু চার্জশিট নেই

মামলায় সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, সাবেক এমপি আফতাব আহমেদসহ ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হলেও গ্রেফতার হয়েছেন মাত্র ১২৫ জন। এর মধ্যেও গুলি চালানোর নির্দেশদাতা বা অভিযুক্ত কোনো পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতার হননি।

অভিযোগ উঠেছে, কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে এই মামলাগুলোতে। অনেক বাদীকে আদালতে এফিডেভিট দিতে বাধ্য করা হয়েছে যেখানে বলা আছে— ‘আসামিদের চিনি না’ অথবা ‘ঘটনাস্থলে আসামি উপস্থিত ছিল না’। সিনিয়র আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা সারাবাংলাকে বলেন, ‘এভাবে এফিডেভিট করলে মামলা দুর্বল হয়। বিচারের সময় বাদীরা সাক্ষ্য দেবেন না, যা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে।’

অবশ্য রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী দাবি করেছেন, ‘গত ডিসেম্বরে ১৯ জুলাই ও ৪ আগস্টের মামলার চার্জশিট প্রস্তুত হয়েছে। একজন পুলিশ সদস্য ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে ঊর্ধ্বতন অনুমতি নিয়েছি।’

জুলাই চেতনায় দুই বছর: শহিদ পরিবারকে সংবর্ধনা

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট নগরীর জুলাই চত্বরে স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার মাইলফলক। শহিদদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হবে।’

আবু সাঈদের বাবা-মা: ‘ফাঁসি কার্যকর দেখে যেতে চাই’

আবু সাঈদ হত্যার বিচারে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ২৮ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। তবে চার মাস পরও রায় কার্যকর হয়নি। বাবা মকবুল হোসেনের কান্নারত অবস্থায় বলেন, ‘ছেলেটা বুক পাতি দিয়ে দাঁড়ালো, পুলিশ গুলি করল। রায় তো হয়েছে, কিন্তু কার্যকর হয়নি। বেঁচে থাকতে যদি ফাঁসি দেখতে পাইতাম, তাহলে মন শান্তি পাইতো।’

মা মনোয়ারা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আবু সাঈদের কবরে মানুষ আসে, বলে বিচার দ্রুত পাও। খালি ডেট দেয়, আমাদেরকে ডেট দিতে দিতে মেরে ফেলবে।”

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ আবু সাঈদ থেকে শুরু করে রংপুরের ৬ শহিদ—প্রত্যেকের রক্তই স্বৈরাচার পতনের বীজ বপন করেছিল। কিন্তু দুই বছর পরেও বিচার প্রক্রিয়া যখন স্তব্ধ, তখন রাজপথের সেই গণজোয়ারের প্রতি বর্তমান সরকারকে দায়বদ্ধ হতে হচ্ছে। জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেলেও, নিহতদের পরিবারের কাছে আজও মূল্যায়নের মাপকাঠি হলো ‘হত্যার বিচার’। শহীদ পরিবারের এই আকুতি ও ন্যায়বিচারের দাবি যেন ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ পায়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা রংপুরবাসী।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর