Saturday 08 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

দলিল নিবন্ধন কমেছে ৩৭% / প্রতি শতাংশ জমির দাম ২৪ হাজার, উৎসে কর ২৫ হাজার টাকা!

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৮ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০৮ | আপডেট: ৮ আগস্ট ২০২৬ ০৮:১৮

রংপুর সিটি করপোরেশন। ফাইল ছবি

রংপুর: রংপুর পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের পর নতুন করে আরও যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডের ৭৯টি মৌজায় জমি হস্তান্তর করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন করব্যবস্থায় ‘চ’ শ্রেণির জমির ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের ৩ শতাংশ অথবা প্রতি শতাংশে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা (যেটি বেশি) হারে উৎসে কর দিতে হচ্ছে। অথচ এসব এলাকায় জমির বাজারমূল্য প্রতি শতাংশ ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ফলে, ন্যূনতম করের হার কখনো কখনো জমির দামের সমান, আবার কখনো কখনে বেশি হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় একবছরের ব্যবধানে এসব এলাকায় জমির দলিল নিবন্ধন কমেছে ৩৭ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

বাস্তবতা বনাম আইন

এনবিআরের গেজেট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ‘চ’ শ্রেণির জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দু’ভাবে উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে। জমির বিক্রয়মূল্যের ৩ শতাংশ অথবা প্রতি শতাংশে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা (যেটি বেশি)। জানা গেছে, নবসংযুক্ত এলাকাগুলোর অধিকাংশই এখনো কৃষিনির্ভর ও গ্রামীণ জমি। সেখানে সড়ক, ড্রেনেজ, বাণিজ্যিক অবকাঠামো বা আবাসন উন্নয়ন খুবই সীমিত। ফলে জমির প্রকৃত বাজারমূল্য পুরনো নগর এলাকার তুলনায় অনেক কম। স্থানীয় বাসিন্দারা এই কর বিধানকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে অভিহিত করছেন।

ক্ষতির মুখে বিক্রেতা ও ক্রেতা

রংপুর নগরের সাতমাথা এলাকার তারিক হোসেনের অভিজ্ঞতা এই সমস্যার প্রতিচ্ছবি। মেয়ের বিয়ের খরচ যোগাতে তিনি প্রতি শতাংশ ২৪ হাজার টাকা দরে জমি বিক্রি করেছেন। কিন্তু রেজিস্ট্রেশনের সময় জানতে পারেন, প্রতি শতাংশে সরকারকে ২৫ হাজার টাকা উৎসে কর দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় না পারছি জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে, না পারছি ক্রেতার টাকা ফেরত দিতে। মেয়ের বিয়েতে সব টাকা খরচ হয়ে গেছে।’ অর্থাৎ তার বিক্রয়মূল্য ২৪ হাজার টাকা/শতাংশ করের ন্যূনতম হারের ২৫ হাজার টাকা চেয়েও কম। ফলে পুরো বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি কর দিতে হচ্ছে তাকে।

দলিল নিবন্ধন কমেছে ৩৭ শতাংশ

রংপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য এই সমস্যার ভয়াবহতা আরও গভীরভাবে তুলে ধরেছে। রংপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, নতুন এই ১৮টি ওয়ার্ডের ৭৯টি মৌজায় ২০২৪ সালে মোট ২ হাজার ৭৮১টি দলিল নিবন্ধিত হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৪৯টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩২টি দলিল কম নিবন্ধিত হয়েছে, যা প্রায় ৩৭ শতাংশ।

এই তীব্র পতন স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, নতুন কর ব্যবস্থা জমির লেনদেনকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। লেনদেন কমে যাওয়ার অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব, রাজস্ব আহরণেও ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের ভূমিসংক্রান্ত বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিটি করপোরেশনের পদক্ষেপ

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে পৃথক চিঠি দিয়েছেন। তিনি নবসংযুক্ত ৭৯টি মৌজাকে এই বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, পূর্ণাঙ্গ নগরায়ণ না হওয়া পর্যন্ত অন্তত নবসংযুক্ত ৭৯টি মৌজাকে এই ন্যূনতম উৎসে করের বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক। এতে মানুষের দুর্ভোগ কমবে এবং ভূমি নিবন্ধনও স্বাভাবিক হবে।’ প্রশাসক আরও বলেন, ‘এসব এলাকার জমির বাজারমূল্য সরকারি নির্ধারিত করের হারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’ তিনি দীর্ঘমেয়াদে এই বিধান স্থানীয় অর্থনীতি ও ভূমিবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

যেভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি

রংপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার সময় ১৫টি ওয়ার্ডের আওতায় ৩৬টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে প্রশাসনিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও ১৮টি ওয়ার্ড এবং ৭৯টি মৌজা সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হয়। এই সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য ছিল নগরসেবা গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু কর কাঠামো হালনাগাদ না করায় পুরনো নগর এলাকার জন্য প্রযোজ্য হার নতুন এলাকায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে কৃষিনির্ভর, অনুন্নত এসব এলাকায় শহরের সমান করের বোঝা চাপানো হয়েছে।

নতুন যুক্ত হওয়া মৌজাগুলো হলো- অভিরাম, রনচন্ডি, বারঘড়িয়া, শেখ তৈয়ব, উত্তম, নিয়ামত, গোয়ালু, মনহর, হরিরাম পিরোজ, হারাটি, পশুরাম, আরাজী পশুরাম, বাহাদুর সিংহ, কোবাবু, আলাকোয়ার, চব্বিশ হাজারি, পয়ধর, বিনোদ, হরিরাম মল, ওলাল বুধাই, কার্তিক, সাহেবগঞ্জ, মহব্বত খাঁ, মনাদর, বুধাই, তপোধন, চান্দকুঠি, কাছনা, বকসা, বুধুকমলা, খলিশাকুড়ি, চিলমন, বেনুঘাট, আরাজী গুলাল বুধাই, বীরচরণ, দামোদরপুর, সন্মানীপুর, বড়বাড়ী, মনোহরপুর, রাজেন্দ্রপুর, জগদীশপুর, কামদেবপুর, পূর্ব গিলাবাড়ী, বিন্যাটারী, রাধাকৃষ্ণপুর, ভবানীপুর, চক ইসবপুর, পক্ষীফান্দা, বক্তারপুর, গোপিনাথপুর, পশ্চিম গিলাবাড়ী, জলকরিয়া, শেখপাড়া, পানবাড়ী, হরিরামপুর, কিসামত বিষনু, আক্কেলপুর, আরাজী ধর্মদাস, নাজির দিগর, তালুক তামপাট, নগর মীরগঞ্জ, খোদ তামপাট, তালুক ধর্মদাস, আরাজী তামপাট, তালুক বকচী, মন্দিরা, আজিজুল্যাহ, রাজু খাঁ, মেকুড়া, হোসেন নগর, তালুক রঘু, ধর্মদাস, রঘু, ফতেপুর, দুর্গাপুর, রতিরামপুর, মন্থনা, গংগাহরি ও সিলিমপুর।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘জমির শ্রেণিবিভাগ ও কর নির্ধারণের সময় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘একটি মাপের কর ব্যবস্থা সারা দেশে প্রয়োগ করা যায় না। জমির উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে করের হার নির্ধারণ করতে হবে। ন্যূনতম করের হার যদি জমির বাজারমূল্যকেও ছাড়িয়ে যায়, তাহলে তা জমির লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে।’

অর্থনীতিবিদরা আরও মনে করছেন, দলিল নিবন্ধন কমে যাওয়া শুধু রাজস্ব আহরণে ঘাটতি তৈরি করবে না, বরং ভূমি-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও সম্পত্তি বিরোধও বাড়াবে।

বিকল্প প্রস্তাব

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত বিষয়ে। তারা বলছেন, ন্যূনতম করের হার প্রতি শতাংশে ১০-১২ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা, শ্রেণিবিভাগ পুনর্নির্ধারণে নবসংযুক্ত এলাকাগুলোকে ‘ঘ’ বা নিম্ন শ্রেণিতে ফেলা, সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ নগরায়ণ না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ কর ছাড় এবং বাজারমূল্য ভিত্তিক কর নির্ধারিত ন্যূনতম হারের পরিবর্তে প্রকৃত বাজারমূল্যের ওপর কর আরোপ করা।

অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই। এনবিআর ও ভূমি মন্ত্রণালয়কে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় জমির লেনদেন আরও কমে যাবে। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাওয়া, সাধারণ মানুষ জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিতে পারে এবং ভূমি-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, সরকার শিগগিরই বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—কতদিন অপেক্ষা করতে হবে সাধারণ মানুষকে? বিয়ের খরচ, চিকিৎসা বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করতে গিয়ে আরও কতজন তারিক হোসেনের মতো বিপাকে পড়বেন এটাই এখন দেখার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর