রংপুর: আলু-ধান-ভুট্টায় বড় লোকসান, বাড়তি সার-ডিজেলের দামে কুলিয়ে উঠতে না পেরেও সংসারের হাল ধরে রেখেছে বসতভিটার সুপারি। রংপুর অঞ্চলে প্রায় ৫৫ লাখ গাছ থেকে বার্ষিক ৩০০ কোটির বেশি টাকার সুপারি উৎপাদিত হচ্ছে। একসময় শৌখিন এই চাষ এখন লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপ নিয়েছে, যেখানে কম খরচে ৪০ বছর পর্যন্ত আয়ের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন কৃষকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি এ ফসলটি উত্তরবঙ্গের কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুপারির গুণগত মান ও বিপণনে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এটি একটি শক্তিশালী রফতানি পণ্য হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
উত্তরাঞ্চলের যতগুলো সুপারিরহাট আছে সেগুলোর মধ্যে বড় একটি হাট রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট বাজার। এই বাজারের সুপারির গলিতে এক বস্তায় ছয় পোন সুপারি (প্রতি পোনে ৮০টি) ধরা হয়। হাটে টাটকা সুপারি বিক্রির উদ্দেশ্যে এসেছেন সুদূর গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার সোনাতলা গ্রামের কৃষক আক্কাশ আলী।
এসব সুপারি তিনি বিক্রি করেছেন প্রতি পোন ৪০০ টাকা দরে। কিন্তু এই আয়ের গল্পটা সহজে আসেনি। এ বছর আলুতে বড় লোকসান, ধান ও ভুট্টায় খরচ তুলতে না পারা, সার-বীজ-ডিজেলের বাড়তি দাম—সব মিলিয়ে যখন কৃষকের লোকসান, তখন আক্কাস আলীর মতো হাজারো কৃষকের চোখ ঘুরেছে বসতভিটার সুপারিগাছগুলোর দিকে।
আক্কাশ আলীর বাড়ির আশপাশে ৬০টি সুপারিগাছ। প্রতিটি গাছে এবার সাত-আট পোন করে সুপারি ধরেছে। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘এ বছর গাছের সুপারি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। সুপারি না থাকলে আমাদের অনেক কষ্ট হতো। এখন গাছ থেকে সুপারি পাড়ি আর বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতে পারি।’
শুধু আক্কাশ আলী নন, একই হাটে সুপারি বিক্রি করতে আসা পীরগঞ্জের চতরা এলাকার কৃষক কাব্য রায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বছর গাছের সুপারি না থাকলে আমাদের পথে বসতে হতো। সুপারি বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।’
বিক্রেতারা বলছেন, এ বছর প্রতি পোন সুপারি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, আর উৎপাদন খরচ খুব কম হওয়ায় এটি এখন কৃষকের নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
আশীর্বাদ হয়ে ওঠা সুপারি
মিঠাপুকুরের ভাঙনি এলাকার ৬৫ বছর বয়সী কৃষক ধনেশ্বর চন্দ্র বর্মণের বসতভিটার চারপাশে ৭০টি সুপারিগাছ। প্রতিটি গাছে এবার আট থেকে নয় পোন সুপারি ধরেছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগের বছরগুলোতে সুপারি বিক্রির টাকা দিয়ে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। কিন্তু এবার আলু আর ধান চাষ করে লোকসানে আছি। তাই সুপারির টাকা দিয়ে সংসার চালাতে পারছি।’
তার ভাষায়, সুপারি এখন তাদের জন্য আশীর্বাদ, কারণ একবার গাছ লাগালে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায় এবং বছরে সামান্য জৈব সার ও পানি দিলেই চলে।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া গ্রামের কৃষক রবিউল আলম (৭০) সুপারিকে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ফসল হিসেবে দেখছেন। আট বিঘা জমির দুটি বাগানে তার প্রায় তিন হাজার সুপারিগাছ রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিবছর ২৫-২৬ লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করেন। অথচ বাগানের পরিচর্যায় বছরে তার খরচ হয় সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা।
রবিউল সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের গ্রামের প্রায় সব কৃষকের বসতভিটার চারপাশে সুপারিগাছ আছে। সুপারি বিক্রি করে সবাই লাভবান হচ্ছেন। অন্য ফসলে লোকসান হলেও এ বছর কৃষকের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে সুপারি।’
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও বাজারচিত্র
রংপুর নগরের সিটি মার্কেটের সুপারির আড়তদার আবদুল হাকিম জানান, প্রতিবছর এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সুপারি কেনা হয়। পরে তা মাটিতে সংরক্ষণ করে সারা বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবছর দুই কোটি টাকার বেশি সুপারির ব্যবসা করি। আমার মতো শতাধিক পাইকার এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কৃষক যেমন লাভবান হচ্ছেন, আমরাও লাভবান হচ্ছি।’
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে রংপুর অঞ্চলে প্রায় ৫৫ লাখ সুপারিগাছ রয়েছে। শুধু এই অঞ্চলেই দেড় হাজারের বেশি বাণিজ্যিক সুপারিবাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগান থেকে প্রতিবছর ৩০০ কোটির বেশি টাকার সুপারি উৎপাদিত হয়।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘একসময় সুপারি চাষ ছিল শৌখিন ব্যাপার। এখন তা লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়া সুপারি চাষের উপযোগী।’
কৃষি অর্থনীতির গবেষক রায়ান আহমেদ রাজু সারাবাংলাকে বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সুপারি চাষ অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানের পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় যেখানে অন্যান্য ফসলের উৎপাদন খরচ ও ঝুঁকি বেশি—সেখানে সুপারি এক সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদী বিকল্প। একবার রোপণ করলে এই গাছ থেকে প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুপারি বাংলাদেশের একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, উন্নত জাতের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে বিপণন করা গেলে এটি একটি শক্তিশালী রফতানি পণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।