ঢাকা: প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। চীনের গত চার দশকের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘Comparative Governance Forum-2026’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিআইআইএসএস এবং চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স (এসআইআরপিএ) যৌথভাবে চার দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ফোরামের আয়োজন করে ।
তিনি বলেন, তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা মানে কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা নয়; বরং নিজস্ব বাস্তবতা ও জাতীয় প্রয়োজনের আলোকে অন্য দেশের সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। গত চার দশকে চীন বিশ্বের অন্যতম সফল উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছে। দেশটি প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে, ব্যাপক বাজার সংস্কার করেছে এবং বৈদ্যুতিক যান, সৌরশক্তি, উন্নত উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব সাফল্য গভীরভাবে অধ্যয়ন ও তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।
উপদেষ্টা বলেন, আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা নিয়ে আলোচনা, উৎপাদন খাতে সহযোগিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থানান্তর এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্বব্যাপী কৌশলগত প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু সংকট ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো দেশ একা সফল হতে পারে না। পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ই ভবিষ্যতের পথ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এখন একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ঘোষিত ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সুশাসনের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। কার্যকর শাসনব্যবস্থা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও জনসেবার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনপ্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে জনসেবা আরও উন্নত করতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা নীতিনির্ধারণ, জ্ঞান বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিআইআইএসএস ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি অয়কাডেমিক ও নীতিগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট। বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাসে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তবে এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি আরও বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। অবকাঠামো, বিমান চলাচল, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ও আঞ্চলিক সংযোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। টেকসই অবকাঠামো, পর্যটন, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনে চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ আগ্রহী।