রংপুর: রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য তুলে ধরেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
বুধবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি জমি বিরোধও একটি কারণ হতে পারে। আসামি সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে তার পূর্বপুরুষদের জমি নিয়ে ক্ষোভের কথা।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাসের আদালতের জবানবন্দিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে- তার পূর্বপুরুষদের জমি গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার কিনেছিল। সেই জমি সম্ভবত বেশি মূল্যে কেনা হয়েছিল এবং জমির শরিকরা তাদের প্রাপ্য টাকা পায়নি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
এছাড়া তিনি জানান, এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের, আর গণপতি চক্রবর্তীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ- সেখানে সামাজিক দূরত্বও ছিল।
আসামিদের স্বীকারোক্তি
কমিশনার জানান, খুনের পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ শ্মশানে গিয়ে আশ্রয় চেয়েছিল। শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ দাস তাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে পুলিশ সেখানে পৌঁছে মুগ্ধকে আটক করে। বিদ্যুৎ দাসও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, হত্যার পর দুই খুনি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তারা বাথরুমে গোসল করে এবং ডাইনিং টেবিলে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। পরে ঘরের জিনিসপত্র উলটে পালটে ডাকাতির নাটক সাজায়। কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এছাড়া ঘটনার সময় প্রতিবেশী এক নারী চিৎকার শুনেছিলেন, কিন্তু তার স্বামী তাকে তথ্য দেওয়ার জন্য পিটিয়েছেন এমন অভিযোগও এনেছেন কমিশনার।
ময়নাতদন্ত ও ধর্ষণ প্রসঙ্গ
কমিশনার জানান, ময়নাতদন্তে চারজনের মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নারী ভিকটিমদের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় কোনো ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। গলায় ফাঁস বা শ্বাসরোধের ফলে মলমূত্র বেরিয়ে আসতে পারে এবং চোখ ফুলে যেতে পারে- এটি স্বাভাবিক, যা পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ক্লিয়ার হয়েছে।
পুলিশের বদলি নিয়ে কমিশনার মাবুদ বলেন, ‘তার বদলি এই হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন আগে অর্থাৎ ১২ আগস্ট হয়েছিল। তার বদলির সঙ্গে এই মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। আগে তার বদলি ইউনিটের কর্মকর্তা অন্যত্র বদলি হওয়ায় তিনি এখনও নতুন জায়গায় যোগ দিতে পারেননি। তবে মামলার তদন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গেই চলছে।’
এরই মধ্যে সীমান্ত দাস নামের এক বন্ধুও আদালতে সাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যার বাড়িতে ঘটনার আগে খুনিরা ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেছিল। এছাড়া খুনিদের ডোপ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মামলার তদন্ত এখনও চলমান এবং আরও তথ্য পাওয়া গেলে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে বলে জানান পুলিশ কমিশনার।
কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থ পেশায় স্বর্ণ কারিগর। সে ওই বাসা থেকে স্বর্ণালংকার বের করে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। পরে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে মাটিতে পুঁতে রাখে। আর মুগ্ধ দাস পালানোর সময় তিন কিলোমিটার দূরে শ্মশানে আশ্রয় নেয়। আগামীর হবু স্বামী অদিত কর ঘটনার পর শুক্রবার (২১ আগস্ট) ও শনিবার (২২ আগস্ট) বারবার ওই বাড়ির সামনে এসেছেন, কিন্তু প্রতিবেশীরা তাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), মেয়ে আগামী (২৩) ও ছেলে প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। তদন্তভার ডিবিতে নেওয়া হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের রহস্য উদঘাটনে কাজ চলছে।