সিলেট: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ নিয়ে ‘তৌহিদী জনতার’ আপত্তি, পালটাপালটি অবস্থান ও নানা জটিলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত উপজেলার সুনাই নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিয়ানীবাজারে নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন।
লাউতা ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গাংপার যুব সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে নামে মানুষের ঢল। বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, গোলাপগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে হাজারো মানুষ এসে যোগ দেন এ উৎসবে। তবে প্রতিযোগিতার ফাইনালে দুই নৌকার আলাদাভাবে দৌড় শেষ করায় কাঙ্ক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফাইনাল হয়নি। ফলে অমীমাংসিতভাবেই শেষ হয় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব।
জানা যায়, সুনাই নদীতে বছরের পর বছর নৌকাবাইচের আয়োজন হয়ে আসছে। তবে এবার ‘তৌহিদী জনতার’ হঠাৎ আপত্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজন নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এবং শুরুতে কথিত তৌহিদী জনতার’ নামে একটি গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নৌকা বন্ধের ঘোষণা করে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সমাধানে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেনকে দায়িত্ব দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে উপজেলার বারইগ্রাম বাজারে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও যুবসমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। পরে লাউতা ইউনিয়নের লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিযোগীরাও নৌকা নিয়ে নদীতে আসেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শুরু হয় প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিকতা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড়, সড়ক ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ভিড় আরও বাড়তে থাকে।
এবারের প্রতিযোগিতায় কালিজুরির ‘পাগলা নৌকা’, শরীফগঞ্জের ‘হাকালুকি বাঘ নৌকা’ ও সুজানগরের ‘স্বাধীন বাংলা নৌকা’ অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ শেষে ফাইনালে মুখোমুখি হয় ‘হাকালুকি বাঘ’ ও ‘পাগলা’ নৌকা।
তবে ফাইনালে দুই নৌকা একই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নেমে পৃথকভাবে দৌড় শেষ করায় দর্শকদের প্রত্যাশিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। এতে ফাইনালের ফলাফল নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা ও নানা জটিলতার পর নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় দর্শকদের মধ্যে উৎসাহ-উচ্ছ্বাসে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।
দর্শকদের কয়েকজন বলেন, নৌকাবাইচ তাদের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামীণ জনপদের মানুষের আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বছরের একবার আয়োজিত এ প্রতিযোগিতা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। সারি সারি নৌকা, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ, বাদ্যযন্ত্রের সুর ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে নদীর পাড় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এ ধরনের প্রতিযোগিতা প্রান্তিক জনপদের মানুষের বিনোদনের অন্যতম খোরাক। নৌকাবাইচ কোনো ধর্মবিরোধী কাজ নয় এবং ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই। আমরা চাই প্রতিবছর নৌকাবাইচ আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে। সুনাই নদীতে প্রতিবছর এ আয়োজন হবে। এটিকে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রক্ষা করতে হবে।’
আগামী প্রজন্মের কাছে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘নৌকাবাইচকে আগামী প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে যা যা করার প্রয়োজন, আমরা সবাই মিলে তা করব।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার, বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল করিম, লাউতা ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, মোল্লাপুর ইউপি চেয়ারম্যান এম এ মান্নান, সুজানগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান নছিব আলী, লাউতা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান গৌছ উদ্দিন, বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন, আতাউর রহমান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজমুল হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
নৌকাবাইচ শেষে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এ আয়োজন তাদের এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। প্রতিবছর নৌকাবাইচ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নদীর পাড়ে ভিড় করেন। এবারও গ্রামের মানুষজন অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেছেন। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এ আয়োজন দেখতে এসেছেন।
আয়োজক সংগঠনের সদস্য আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সুনাই নদীর আজকের নৌকাবাইচ দেখতে মানুষের ঢলই প্রমাণ করেছে নৌকাবাইচ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এটিকে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাবাইচের মতো প্রাচীন এই প্রতিযোগিতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’