রংপুর: রংপুর নগরী ও এর আশপাশের এলাকায় মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় চরম উৎকণ্ঠায় জেলাবাসী। এর মধ্যে মাছুয়াপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনাটি সবচেয়ে আলোচিত। পুলিশের দাবি, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। তবে মামলার তদন্তে সময়রেখা ও ফরেনসিক প্রমাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, যা এই হত্যাকাণ্ডের রহস্যকে আরও গভীর করেছে।
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গত ২২ আগস্ট রাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তীর (১২) মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকে পুরো এলাকা উত্তাল। প্রাথমিকভাবে পুলিশ দুই যুবককে গ্রেফতার করে এবং মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের একটি বর্ণনা দিলেও, পরবর্তী সময়ে পুলিশের বর্ণনায় পরিবর্তন আসে এবং ঘটনার সময়রেখা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা ও পুলিশের বর্ণনার অসঙ্গতি
পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি তাদের দেখে ফেললে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং এর পরেই চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
তবে এই বর্ণনায় অসঙ্গতি রয়েছে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় তার বোনের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন তিনি দেখেন, রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোনের নম্বর থেকে একটি ফোন এসেছিল, যা তিনি ধরতে পারেননি। এই সময়ে পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড ঘটার কথা নয়, যা প্রশ্ন তুলেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মো. আবদুল মাবুদ দুটি পৃথক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাক্রমের ভিন্ন বর্ণনা দেন। প্রথম বর্ণনায় তিনি রাতে হত্যাকাণ্ডের কথা বললেও, দ্বিতীয় বর্ণনায় তিনি বলেন, ভোরে গণপতি অভিযুক্তদের দেখতে পান।
ফরেনসিক প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ফরেনসিক প্রমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, শ্বাসরোধের যে দড়ি বা কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করছে, তা তিনি পাননি। এছাড়া মর্গের সহকারী জতন কুমার দাবি করেছেন, তিনি নিহত মা ও মেয়ের শরীর থেকে বীর্যের মতো কিছু বের হতে দেখেছেন, যা পরীক্ষার পর নেতিবাচক এসেছে।
পুলিশ দাবি করেছে, অভিযুক্তরা হত্যার পর বাড়িতে গোসল করেছে, খাবার খেয়েছে এবং ঘর তছনছ করেছে। কিন্তু আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি অভিযুক্তরা বাড়িতে অবস্থান করে থাকে, তাহলে তাদের ডিএনএ, আঙ্গুলের ছাপ, চুল ও ত্বকের কোষ বাথরুম, আসবাবপত্র ও দরজায় থাকার কথা। এই নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
শিক্ষক পরিবারের চারজন হত্যার আগে রংপুর নগরী ও আশপাশের এলাকায় আরও চারজন খুন হয়েছেন। ১০ আগস্ট হারাগাছের আরাজি বীরচলন এলাকায় পলাশ নামে এক যুবক হামলার শিকার হন এবং ২০ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ১৩ আগস্ট নগরীর তাজহাট আনসারি মোড় এলাকার একটি রিক্সা গ্যারেজ থেকে আব্দুর রহমানের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৩ আগস্ট হারাগাছ থানা এলাকায় আবু সিদ্দিক নামে এক যুবকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। আর সবশেষ গঙ্গাচড়ায় অজ্ঞাত এক যুবকের গলা কাটা মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এসব ঘটনায় নগরবাসী আতঙ্কিত। নগরির বাসিন্দা আব্দুল হাই প্রধান বলেন, ‘রংপুর শান্তির শহর ছিল, কিন্তু এখন আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, ‘সন্ধ্যার পরও যদি বাইরে থাকি, মাথায় একটা চিন্তা কাজ করে—আমার বাবা-মা বাসায় নিরাপদ তো?’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের জেলা সভাপতি আইনজীবী জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ না করলে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে না।’
তবে মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী দাবি করেন, প্রত্যেকটি ঘটনার আসামি গ্রেফতার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি।