Sunday 30 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে ৪ হত্যা: ডিবি হেফাজত থেকে ছাড়া পেল আসামি সিদ্ধার্ধের পরিবার

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩০ আগস্ট ২০২৬ ১১:২৩

রংপুর: রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে (১২) শ্বাসরোধে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় প্রধান আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় চন্দ্র দাস ও বড় ভাই পার্থ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের পর মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে ডিবি পুলিশ।

শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় মাছুয়াপাড়ার নিজ বাসা থেকে তাদের আটক করে প্রায় ছয় ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত সাড়ে ১২টায় ডিবি কার্যালয় থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। তদন্তভার হস্তান্তর, বক্তব্যের অসঙ্গতি, সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগ এবং নানা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে তদন্ত। খুনের রহস্য উদঘাটনে ডিএনএ ও ডোপ টেস্টের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের কারণ

রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিদ্ধার্থের বাবা ও ভাইকে গত কয়েক দিন ধরে ডাকা হলেও তারা ডিবি কার্যালয়ে আসেননি। তাই আজ সন্ধ্যায় তাদের বাসা থেকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছিল। পরে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, ‘হত্যার ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানতে চেয়েছে পুলিশ। আমরা যতটুকু মিডিয়ায় বলেছি, ততটুকুই পুলিশকে জানিয়েছি।’

সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগ

চার খুনের ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রধান আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বড় ভাই পার্থ দাস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার মাছুয়াপাড়ায় খবর সংগ্রহ করতে গেলে দৈনিক খবরের কাগজের রংপুর প্রতিনিধি সেলিম সরকারকে একদল ব্যক্তি ঘিরে ধরে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ। এ সময় তার মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নেওয়া এবং শরীর তল্লাশির নামে হেনস্তা করা হয়।

সেলিম সরকারের অভিযোগ, পার্থ দাসের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অজ্ঞাত কয়েকজন যুবকও তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। খবর পেয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

সাংবাদিক হেনস্তার প্রতিবাদে পরে গণমাধ্যমকর্মীরা নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। বক্তারা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা ও হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ডিবি উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

তদন্তে নতুন মোড় ও বক্তব্যের অসঙ্গতি

গত ২২ আগস্ট রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাসকে (২৩) গ্রেফতার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, গ্রেফতার দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট করা হবে। ময়নাতদন্তে প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহে ধর্ষণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং তাদের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ।

আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তারা ঘটনার রাতে আটটি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেছিলেন। তারা মাছুয়াপাড়ার প্রতিবেশী দেবু বাড়ির ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন এবং পানির ট্যাঙ্কের পেছনে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। ভোররাতে সেখানে হাঁটতে থাকা গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলেন এবং তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘এত ভোরে এখানে কী করছ?’। এরপর তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয় এবং গণপতি চিৎকার করে দিতে পারেন, এই আশঙ্কায় তারা তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

পরবর্তী সময়ে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাদেরও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ছোট ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলে এবং ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ বললে তাকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর তারা বাড়িঘর তছনছ করে ডাকাতির নকল তৈরি করে এবং গোসল করে খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু পুলিশের বক্তব্যে নানা অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, স্ত্রী ও মেয়ে সিঁড়িতে এবং ছেলে ঘুমন্ত অবস্থায় নিহত হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে নিহত হয়েছেন এবং তাদের মরদেহ সিঁড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হত্যার সময়ও পরিবর্তন করা হয়েছে।

জমি বিরোধ ও জাতদ্বন্দ্বের অভিযোগ

পুলিশ কমিশনার আগে জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও জাতদ্বন্দ্ব থাকতে পারে। নিহত গণপতি চক্রবর্তী সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে জমি কিনে বাড়ি করেন। এই জমি কেনাকে ঘিরে জমির শরিকরা প্রাপ্য টাকা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া গণপতি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান ছিলেন এবং এলাকার দাস সম্প্রদায়ের মানুষজনকে তিনি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতে দিতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নিহতের ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘জমিটি অনেক আগে কেনা হয়েছিল এবং এ নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না।’

তদন্তের অগ্রগতি

এরই মধ্যে এই মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন ডিবি কর্মকর্তা জিন্নাত আলীকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন কমিশনার মাহবুবুর রশিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ। ডিএনএ ও ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হবে।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর