ঢাকা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই এজলাসে এখন চলছে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিচার কার্যক্রম। গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এখন পর্যন্ত দায়ের হয়েছে ৭২টি মামলা। এসব মামলায় মোট ৫০৩ জন আসামি, যাদের মধ্যে ৩১৫ জন পলাতক এবং ১৮৫ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। ন্যায় বিচার প্রত্যাশী ভুক্তভোগীরা তো বটেই সারাদেশের সচেতন ও কৌতূহলী মানুষের দৃষ্টি এখন ট্রাইব্যুনালের ওপর নিবদ্ধ।
এরই মধ্যে ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এসব রায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে ৪৬ জনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচিত বাকি ৬৬টি মামলার বিচার এখনো চলমান। এর মধ্যে দুটি মামলা রায়ের অপেক্ষায়, ২৩টি বিচারাধীন এবং ৪১টি তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে।
দুই ট্রাইব্যুনালে সমান্তরাল বিচার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে বর্তমানে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে।
প্রথম ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয় ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। পরে ২০২৫ সালের ৮ মে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
বর্তমানে প্রসিকিউশনে ২৩ জন প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থায় ২৬ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
রায়ের অপেক্ষায় দুই মামলা
ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে দুটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর একটি কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। এতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজন আসামি।
অন্য মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। যে কোনো সময় এ মামলারও রায় ঘোষণা হতে পারে।
বিচারাধীন ২৩ মামলা
বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে ২৩টি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত ১৪টি এবং গুম-খুনের ৯টি মামলা রয়েছে।
বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক এমপি শামীম ওসমান, সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ আরও অনেকে।
তদন্তে আরও ৪১ মামলা
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার হাতে বর্তমানে রয়েছে ৪১টি মামলা।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর অভিযান, গুম-খুন ও নির্যাতনের অভিযোগ, শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ বিভিন্ন সাবেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক, অধ্যাপক মাকসুদ কামাল ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে করা মামলা।
কোনো কোনো মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, আবার কয়েকটি মামলার তদন্ত এখনও চলমান।
ছয় মামলায় যা রায়
এ পর্যন্ত ঘোষিত ছয়টি রায়ের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত রায় ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।
ট্রাইব্যুনাল দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পান। এছাড়া—
– চাঁনখারপুলের ছয় হত্যা মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড;
– আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড, সাতজনের যাবজ্জীবন;
– আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড;
– রামপুরায় তরুণকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড;
– জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
৫০৩ আসামি, পলাতক ৩১৫
ট্রাইব্যুনাল সূত্র বলছে, ৭২ মামলায় মোট আসামি ৫০৩ জন। এদের মধ্যে-
পলাতক: ৩১৫ জন,
গ্রেফতার: ১৮৫ জন,
একজন আত্মহত্যা করেছেন,
একজন সাজা ভোগ করছেন।
তবে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় অনেককে একাধিকবার আসামি হিসেবে গণনা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রয়েছে সাতটি পৃথক মামলা।
রাষ্ট্রপক্ষ যা বলছে-
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মাত্র দেড় বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলার রায় দিতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে বিরল।
তার ভাষায়, আমাদের লক্ষ্য একটাই কোনো অপরাধী যেন পার না পায়, আবার কোনো নিরপরাধ মানুষও যেন হয়রানির শিকার না হন। লোকবল ও নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিচারকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সামনে কী
বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রায়ের অপেক্ষায় থাকা দুটি মামলা নিষ্পত্তি, ২৩টি বিচারাধীন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করা এবং তদন্তাধীন ৪১টি মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা।
এসব মামলার অগ্রগতি শুধু বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশাই নয়, দেশের বিচারব্যবস্থার সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। তাই আগামী কয়েক মাস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রতিটি কার্যক্রম দেশজুড়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হবে।