রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের লাইব্রেরিতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন বইয়ের সংকট অব্যাহত। লাইব্রেরিতে থাকা অধিকাংশ বই পুরোনো সংস্করণের হওয়ায় প্রয়োজনীয় ও হালনাগাদ পাঠ্যবই পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। এর সঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত আসনের অভাব, সীমিত সময় ও বই ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা। ফলে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও চাহিদাসম্পন্ন বই লাইব্রেরিতে থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোই পুরোনো সংস্করণের। নতুন সংস্করণের বই নিয়মিত যুক্ত না হওয়ায় বর্তমান সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনা ও রেফারেন্সের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পরীক্ষার সময় প্রয়োজনীয় বইয়ের চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত কপি না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে বাইরে থেকে বই কিনতে কিংবা ফটোকপি করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতি বছর বিভিন্ন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বইয়ের তালিকা দেওয়া হলেও সেই তালিকা অনুযায়ী নতুন বই লাইব্রেরিতে যুক্ত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতির বইয়েও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়েও শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরির বাইরে নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের পুরাতন বিজ্ঞান ভবনের নিচতলায় লাইব্রেরির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা থাকে। তবে তুলনামূলক কম সংখ্যাক আসন থাকায় লাইব্রেরিতে এসেও আসন না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। লাইব্রেরির পরিবেশেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, আধুনিক পাঠসুবিধা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
বই সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে সমস্যা। অনেক বই অগোছালো অবস্থায় থাকায় প্রয়োজনীয় বই খুঁজে পেতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার লাইব্রেরির তালিকায় থাকা বই বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায় না—এমন সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তারা।
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী বিল্লাল হোসেন বলেন, লাইব্রেরিতে সবসময় বই অগোছালো অবস্থায় থাকে। নির্দিষ্ট কোনো বই পড়ে রেখে দিলে পরদিন সেটি খুঁজে পেতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। বিভাগের বইগুলোও অনেক পুরোনো সংস্করণের। এ ছাড়া বিভাগে যতসংখ্যক বই থাকা প্রয়োজন, সে তুলনায় পর্যাপ্ত বইয়ের সংকট রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত বছর আমরা যেসব বইয়ের তালিকা দিয়েছিলাম, তার এক শতাংশ বইও লাইব্রেরিতে এসে পৌঁছায়নি। এ ছাড়া চাকরির প্রস্তুতির বইয়েরও সংকট রয়েছে, যা একজন শিক্ষার্থীকে চাকরির পরীক্ষায় পিছিয়ে দিতে পারে।
ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন বলেন, ফার্স্ট ইয়ার থেকে আমরা বইয়ের যেসব তালিকা দিয়ে আসছি, সেই অনুযায়ী কোনো আপডেট হচ্ছে না। আমাদের লাইব্রেরির সময়ও অনেক কম। আমার মনে হয় সাত কলেজের আর কোনো কলেজেরই লাইব্রেরির সময় এত কম না। লাইব্রেরির সময় অন্তত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা করা উচিত। আবার একাডেমিক বই পুরোনোগুলো থাকলেও আপডেট বইগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না।
লাইব্রেরিতে নতুন বই আসার বিষয়ে লাইব্রেরি সহকারী আম্বিয়া খাতুন বলেন, আমাদের বাজেটগত সমস্যা আছে। এখানে কপি বই না কিনে লাইব্রেরির জন্য রেফারেন্স বই কেনা হলে সমস্যাগুলো কমবে। প্রতিবছর বইয়ের জন্য যে বাজেট দেওয়া হয়, সেই অনুযায়ী বই লাইব্রেরিতে আসে না।
তিনি আরও বলেন, এসব সমস্যা নিয়ে আমরা অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। এমনকি অধ্যক্ষ স্যার নিজেও লাইব্রেরি পরিদর্শন করেছেন। বছরে একবার বই কেনা হয়। লাইব্রেরিতে কপি বই নেই—বিষয়টি এমন নয়, তবে শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী বইয়ের স্বল্পতা রয়েছে।

এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ছদরুদ্দিন আহমদ বলেন, লাইব্রেরির জন্য যে বাজেট আসে, সেটা লাইব্রেরিতেই যাবে। এখানে অনার্স-মাস্টার্সের মধ্যে চাকরির বই কিনে লাইব্রেরিতে দেওয়া হবে না। তবে শিক্ষার্থীদের উপকারের জন্য কিছু চাকরির প্রস্তুতির বইয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
লাইব্রেরির জায়গা সংকটের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, বর্তমান জায়গায় এই সংকট এখন আর সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে পুরাতন বিজ্ঞান ভবন ভেঙে সেখানে ১৫ তলা ভবন নির্মাণের কথা চলছে। ওই ভবনের একটি পুরো তলা লাইব্রেরির জন্য করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন ভবন নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমান লাইব্রেরির সমস্যাগুলোও দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন সংস্করণের একাডেমিক ও রেফারেন্স বই নিয়মিত সংযোজন, প্রয়োজনীয় বইয়ের পর্যাপ্ত কপি নিশ্চিত করা, বই সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং লাইব্রেরির সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
তাদের মতে, লাইব্রেরিতে শুধু পুরোনো বই থাকলে শিক্ষার্থীরা বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পিছিয়ে পড়বেন।