ঢাকা: দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় আনতে তাদের ঋণের আওতায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, শুধু ঋণ দিলেই হবে না, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের মানোন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখা সম্ভব হবে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মাইক্রোফাইন্যান্স অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ফান্ড প্রকল্পের উদ্বোধন ও ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মাইক্রোফাইন্যান্স অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ফান্ড একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে ৫০ কোটি টাকা দিয়ে শুরু করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দেশের শিক্ষিত, কম শিক্ষিত ও হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে থাকা সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগানো। অনেক মানুষ ব্যাংকে যেতে ভয় পান কিংবা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার নেই। তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করাই এ ধরনের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিন ধরে এনজিওগুলো মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচির মাধ্যমে এ ধরনের মানুষের কাছে ঋণ পৌঁছে দিচ্ছে। তবে এই প্রকল্পটি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মূলধন ও সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অর্থ ব্যবহার করে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, অনুদানের টাকা অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। কারণ টাকা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগে দায়বদ্ধতা তৈরি হয় না। কিন্তু ঋণের সঙ্গে একটি খরচ বা সুদ যুক্ত থাকায় উদ্যোক্তার মধ্যে সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে আয় করার তাগিদ তৈরি হয়। যেকোনো টাকার যদি একটি কস্ট না থাকে, সেখানে কারও ইনসেন্টিভ থাকে না। যখনই কস্ট থাকবে, তখনই ইনসেন্টিভটা আসবে। তবে উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি সঠিক মানুষ চিহ্নিত করা এবং তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ মৃৎশিল্প, তাঁত, কাঁসা ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবার তিন-চার প্রজন্ম ধরে একই কাজ করে আসছে। কিন্তু তারা তাদের কাজকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারছে না। এসব মানুষকে শুধু ঋণ নয়, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ের সহায়তা দিতে হবে। একটি পণ্যের ডিজাইন ও মান উন্নত করা গেলে তার বাজারমূল্য কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। ১০০ টাকার একটি পণ্য দক্ষতা উন্নয়ন, ভালো কাঁচামাল, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব।
এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারেও নেওয়ার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অ্যামাজন, আলিবাবা ও ই-বে’র মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ ও সৃজনশীল পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাজারজাত করা সম্ভব। এ কারণেই সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নিয়ে কাজ করছে। এই উদ্যোগের আওতায় উদ্যোক্তাদের ঋণের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইনিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ডিজাইনারদের একটি পুলও তৈরি করা হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতির পরিধি শুধু প্রচলিত হস্তশিল্পে সীমাবদ্ধ নয় বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। গান, সংগীত, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, ওটিটি, ফুড ও কুলিনারি শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘মিউজিকের কোনো বাউন্ডারি নাই’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গান এখন মানুষ শুনছে। কোরিয়ান পপসহ বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক পণ্য বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিভাবান শিল্পী ও সৃজনশীল মানুষদেরও সহায়তা করে তাদের কাজকে বৈশ্বিক পণ্যে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। দেশের গ্রামীণ গান ও লোকজ সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে যথাযথভাবে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। এখন এগুলোকে মনিটাইজ করার উদ্যোগ নিতে হবে। একটি সাধারণ মানুষের গাওয়া গান জনপ্রিয় হয়ে শত কোটি টাকার পণ্যে পরিণত হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া আইসিটি খাত ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত তরুণদেরও এ উদ্যোগের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এসব খাতে থাকা প্রতিভাকে পণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উপযোগী করে তুলতে হবে।
নিজের থাইল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রডাক্ট’ মডেলের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের তৈরি পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ নিজ বাড়িতে পণ্য তৈরি করলেও সরকার তাদের কাঁচামাল, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংসহ বিভিন্ন সহায়তা দেয়। পরে প্রস্তুত পণ্য সংগ্রহ করে সরাসরি বিমানবন্দরের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ সময় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ উল্লেখ করে তা আরও কমিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেন অর্থমন্ত্রী। এতে ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাইক্রোফাইন্যান্স অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ফান্ডের ৫০ কোটি টাকার পাইলট প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে এ কর্মসূচিতে আরও অর্থায়ন করা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এই প্রকল্প সফল হলে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। এতে ব্যাংকের কার্যক্রম ও মুনাফা বাড়বে এবং ব্যাংক আরও বেশি উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন করা গেলে শুধু তাদের জীবনযাত্রার মানই পরিবর্তন হবে না, দেশের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসাকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখতে হবে।