ঢাকা: বাংলাদেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নানা অজুহাতে ঋণ বিতরণ কমিয়ে দিয়েছে। তবে বৈদিশিক লেনদেনে কমিশন ও চার্জ থেকে প্রাপ্তি ভালো হওয়ায় মুনাফা বেড়েছে। গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণ ও অগ্রিম কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা, যা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কম । আর ২০২৫ সালের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা থেকে কমে ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় নেমে এলেও বিদেশে পাঠানো মুনাফা বেড়ে একহাজার ৩১৪ কোটি টাকা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের কেবল দ্বিতীয়ার্ধে ৫৬২ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের বিশেষ সমীক্ষা ও প্রকল্প বিভাগ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৭০টি শাখা ও পাঁচটি উপ-শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এসব ব্যাংক বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যদিও আমানত, ঋণ ও শাখা নেটওয়ার্কের দিক থেকে দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় তাদের উপস্থিতি সীমিত, তবুও গুণগত অবদান উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে মোট ব্যাংকিং খাতের আমানতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। আমানতের মধ্যে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অংশই সবচেয়ে বেশি, যা মোট আমানতের ৩৯ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা আমানত, যার অংশ ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে স্থায়ী আমানতের অংশ ১৬ শতাংশ, স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য আমানত ২৩ শতাংশ।
তথ্য বলছে, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শিল্প খাত বিদেশি ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় গ্রাহক। মোট ঋণের ৫২ শতাংশ শিল্প খাতে এবং ২০ শতাংশ ব্যবসা ও বাণিজ্যে গেছে। কনজ্যুমার ফাইন্যান্সের অংশ ১৬ শতাংশ, অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ৪ শতাংশ। শিল্প খাতে ঋণ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিপরীতে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ৭২৬ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও এ খাতে মোট অংশ এখনও তুলনামূলক ছোট, তবে এটি উৎপাদনশীল ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর বাড়তি আগ্রহের ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, তা ২০২৫ সালের জুনে ৬ দশমিক ১ শতাংশে উঠে এবং ডিসেম্বর শেষে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই হার এখনও অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈদেশিক লেনদেনেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি আয় দেশে এসেছে, যা জাতীয় রফতানি আয়ের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। তৈরি পোশাক, চামড়া ও ইপিজেড ভিত্তিক শিল্পে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধ হয়েছে, যা মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। এসব আমদানির বড় অংশই ছিল টেক্সটাইল, কাঁচামাল, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রপাতি এবং শিল্প উৎপাদনের উপকরণ।
এদিকে শ্রমিকদের রেমিট্যান্স আহরণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা এখনও সীমিত। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ৪৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের মোট রেমিট্যান্সের মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের ওপর দাবি মোট সম্পদের ২২ শতাংশ এবং সরকারি খাতের ওপর দাবি ১৩ শতাংশ। বিদেশি সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা হয়েছে, যা মোট সম্পদের ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে মোট দায়ের মধ্যে আমানতের অংশ ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বিদেশি দায় বেড়ে ১০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা হয়েছে। মূলধন ও সঞ্চিতি ১৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা মোট দায়ের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যালেন্স শিটের সম্পদের ৫৬ শতাংশের বেশি এবং দায়ের ৬২ শতাংশের বেশি “অন্যান্য” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ, যা মূলত অফ-ব্যালেন্স শিট বা সম্ভাব্য সম্পদ ও দায়ের বিপরীত এন্ট্রি । এটি ইঙ্গিত করে যে বিদেশি ব্যাংকগুলো স্থানীয় ঋণ সম্প্রসারণের তুলনায় উচ্চ মাত্রার তারল্য ধরে রাখছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো হেলাল আহমেদ জনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। উচ্চ মূলধন পর্যাপ্ততা, পর্যাপ্ত তারল্য, কম খেলাপি ঋণ এবং ভালো মুনাফা তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতার প্রমাণ। বিশেষ করে বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান দেশের বৈদেশিক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
তিনি বলেন, ‘ঋণ বিতরণে ধারাবাহিক সংকোচন এবং মোট ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়া নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন আরও বাড়ানো এবং করপোরেট গ্রাহকের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার ও প্রভিশন কাভারেজের পরিবর্তনের ওপর নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, যাতে এই ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের মান অক্ষুণ্ন থাকে।’