আজ ২১ জুলাই, দেখতে দেখতে কেটে গেছে একটি বছর। সময়ের ক্যালেন্ডারে আরেকটি পৃষ্ঠা যোগ হয়েছে, কিন্তু উত্তরা মাইলস্টোনের সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি আজও যেন থমকে আছে। সেই দিনটি শুধু একটি দুর্ঘটনা ছিল না; ছিল অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার দিন, ছিল শিশুদের হাসি থেমে যাওয়ার দিন, ছিল এক জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নির্মম বাস্তবতা।
যে বাবা সকালে সন্তানের কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, ‘স্কুল শেষে দেখা হবে’, তিনি বিকেলে ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতাল আর মর্গের সামনে। যে মা সন্তানের পছন্দের খাবার রান্না করে অপেক্ষা করছিলেন, তিনি ফিরে পেয়েছিলেন শুধু নিথর দেহ, কিংবা অনিশ্চয়তার দীর্ঘ চিকিৎসাযুদ্ধ। অনেকেই ফিরে এসেছিল, কিন্তু আগের মতো নয়। কারও শরীরে রয়ে গেছে পোড়া দাগ, কারও মনে এমন ক্ষত, যা কোনো অস্ত্রোপচার কিংবা ওষুধে মুছে যাওয়ার নয়।
এক বছর পরও সেই কান্না থামেনি। থামেনি দুঃস্বপ্ন। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া অনেক শিশুর চোখে এখনো ভেসে ওঠে সেই আতঙ্ক। অনেক অভিভাবক আজও সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সময় অজানা এক ভয় বুকে নিয়ে বিদায় জানান।
সেই ঘটনার পর দেশের মানুষ একটি প্রশ্ন বারবার তুলেছিল— ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এত কাছ দিয়ে কেন বিমান চলাচল? নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় ছিল ঘাটতি? ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন আনা হবে? কয়েক সপ্তাহ ধরে এসব প্রশ্ন নিয়ে তুমুল আলোচনা, লেখালেখি আর প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার তীব্রতা কমেছে, সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলেছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। অথচ যাদের সন্তান আর ফিরে আসেনি, তাদের জীবনে সময় যেন সেদিনেই থেমে আছে।
আমাদের সমাজে একটি নির্মম বাস্তবতা বারবার ফিরে আসে—ঘটনা ঘটে, আমরা শোক জানাই, প্রতিবাদ করি, কিছুদিন আলোচনা হয়; তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু ভুলে যাই। কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষত ভুলে যায় না স্বজনরা। ভুলে যায় না সেই খালি চেয়ার, সেই নিঃশব্দ ঘর, সেই অসমাপ্ত বই-খাতা, সেই স্কুলব্যাগ, যা আজও অনেক পরিবারের কাছে সন্তানের শেষ স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে।
একটি দুর্ঘটনা শুধু প্রাণ কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন, হাসি এবং অসংখ্য পরিবারের মানসিক শান্তি। তাই স্মরণ শুধু ফুল দেওয়া বা দোয়া করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন কঠিন প্রশ্নের জবাব, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাস্তব উদ্যোগ এবং এমন ব্যবস্থা, যাতে আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের জন্য মর্গের সামনে দাঁড়াতে না হয়।
এক বছর পেরিয়ে গেছে। স্মৃতি হয়তো সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়, কিন্তু মাইলস্টোনের ক্ষত এখনো তাজা। সেই ক্ষত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দুর্ঘটনা ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষা ভুলে গেলে ইতিহাস নিজেকে আবারও নির্মমভাবে পুনরাবৃত্তি করে।