Wednesday 12 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মূল্যস্ফীতি কমছে, মানুষের কষ্ট কমছে কি?

সানজিদা যুথী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১২ আগস্ট ২০২৬ ১৬:২৩

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি স্বস্তির খবর এসেছে—মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে। এর আগের মাস জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে।

খবরটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—মূল্যস্ফীতি কমছে, তাহলে মানুষের কষ্টও কি কমছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ কী। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামার অর্থ পণ্যের দাম ৯ শতাংশ কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। অর্থাৎ যে পণ্যটি গত বছর ১০০ টাকায় কেনা যেত, সেটির দাম এখন ১০৮ টাকার বেশি হলে সেটিকে মূল্যস্ফীতি কমার মধ্যেও স্বাভাবিক হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু একজন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের কাছে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ই বাস্তব চাপ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে—যা গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি কমে আসাই এর অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু বাজারে কয়েক মাস ধরে যে উচ্চমূল্য তৈরি হয়েছে, মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দামগুলো আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।

এটাই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা আর অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যকার সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা ধরা যাক। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, বাজার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাস, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ মেটাতেই আয়ের বড় অংশ চলে যায়। বছর শেষে তার বেতন হয়তো কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু যদি ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে কাগজে আয় বাড়লেও বাস্তবে তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

বাংলাদেশে এই বাস্তবতাটিই দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে। জুনে দেশের জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ গড় হিসাবে মজুরি বাড়ার চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়েছে।

অর্থনীতির ভাষায় এটিই প্রকৃত আয় বা ‘রিয়েল ইনকাম’-এর ওপর চাপ।

ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সংবাদটি স্বস্তির হলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরে আসতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে। কারণ মানুষ প্রতিদিনের বাজারে আজকের দাম দিয়ে কেনাকাটা করে; গত বছরের সঙ্গে তুলনা করে নয়।

তাহলে মূল্যস্ফীতি কমার সুফল কোথায়?

সুফল অবশ্যই আছে। মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকলে মানুষের ওপর নতুন করে মূল্যচাপ কিছুটা কমে। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ খরচ সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে ভালো ধারণা করতে পারেন। বিনিয়োগের পরিবেশও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বর্তমানে নীতিগত সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে।

তবে এখানেও রয়েছে আরেকটি বড় প্রশ্ন—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যদি ঋণের সুদ অনেক বেশি থাকে, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসা কতটা গতি পাবে?

একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও ধরে রাখতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য করাই এখন নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের জন্য IMF বাংলাদেশের প্রকৃত GDP প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশ অনুমান করেছে।

অর্থাৎ সামনে পথ একেবারে মসৃণ নয়।

সবচেয়ে বেশি চাপ কোথায়?

মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সবার ওপর সমান নয়। উচ্চ আয়ের মানুষ তাদের ব্যয়ের একটি অংশ কমিয়ে বা সঞ্চয় থেকে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। কিন্তু নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যে চলে যায়।

তাই খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব পড়ে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—শুধু মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কোন পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে, সেই পণ্যটি একটি পরিবারের মোট ব্যয়ের কত অংশ দখল করে এবং পরিবারের আয় কতটা বেড়েছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

একজন মানুষের জন্য বাজারের চাল-ডাল-সবজির দাম গুরুত্বপূর্ণ; আরেকজনের জন্য বাড়িভাড়া বা সন্তানের শিক্ষার খরচ। ফলে জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সবসময় একরকম নাও হতে পারে।

এখন দরকার শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো নয়

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনা নয়; বরং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।

এর জন্য একসঙ্গে কয়েকটি জায়গায় কাজ করতে হবে।

বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হবে। অযৌক্তিক সিন্ডিকেট ও কারসাজি ঠেকাতে হবে। কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তাও যেন অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে বাধ্য না হন—সেই সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করতে হবে।

একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। কারণ শুধু দাম নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের আয় না বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসবে না।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি, রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক শুধু GDP বা মূল্যস্ফীতির সংখ্যা নয়; সেই সংখ্যার প্রভাব মানুষের জীবনে কতটা পড়ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক সংকেত। কিন্তু এটিকে এখনই বিজয় ঘোষণা করার সময় নয়। কারণ দাম বাড়ার গতি কমেছে, দাম কমেনি; আর মানুষের আয় যদি সেই ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে স্বস্তির পরিসংখ্যান বাস্তব জীবনের স্বস্তিতে রূপ নিতে সময় লাগবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—মূল্যস্ফীতি কমছে, কিন্তু মানুষের কষ্ট কি সত্যিই কমছে?

এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তখনই, যখন বাজারের দামের পাশাপাশি মানুষের আয়, সঞ্চয়, ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রায়ও স্বস্তি ফিরবে।

সারাবাংলা/এসজে/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর