Saturday 15 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে অনলাইন জুয়া / আসক্ত কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ, বাড়ছে আত্মহত্যা ও নিঃস্বের মিছিল

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৯ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১৪

অনলাইন জুয়ার প্রতীকী ছবি। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: রংপুর অঞ্চলে অনলাইন জুয়ায় তরুণ থেকে প্রবীণ সব বয়সি মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ছে। ‘ফ্রি স্পিন’, ‘সাইন আপ বোনাস’ ও ‘ঘরে বসে লাখপতি’ হওয়ার লোভনীয় সব বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে অনেকেই নিঃস্ব হচ্ছেন। ঋণের চাপ ও মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি রংপুর নগরীতে মানিক নামের এক রিকশাচালকের আত্মহত্যার ঘটনা এ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিবারের খরচ চালাতে গিয়ে তিনি নিজের রিকশা ও স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেন। পরে ঋণের বোঝা ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন বলে জানান তার স্বজনেরা।

মানিকের বন্ধু হৃদয় বলেন, ‘মানিক দীর্ঘদিন থেকে ক্যাসিনো খেলত। ক্যাসিনোর নেশায় বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল। জুয়া খেলায় হেরে ঋণের চাপ ও মানসিক যন্ত্রণায় শেষ পর্যন্ত গলায় ফাঁস নেয় সে। তার মৃত্যুর মূল কারণ ক্যাসিনো।’

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীরা জানান, শুরুতে অল্প টাকায় বড় লাভের প্রলোভন দেখিয়ে এসব সাইটে যুক্ত করা হয়। পরে ‘হাতেখড়ি বোনাস’ দিয়ে তাদের ধরে রাখা হয়। এতে দ্রুত লাভের বিভ্রম তৈরি হয় এবং আসক্তি বাড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘জুয়ার সাইট থেকে আপনারা কিচ্ছু পাবেন না, ভাই। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। ১ হাজার, ২ হাজার, ৩ হাজার টাকা করতে করতে আমি প্রায় এক লাখ টাকা হারিয়েছি। এটা ছিল আমার জমানো টাকা। আমি নিঃস্ব হয়ে নিজে এখন ভাড়া বাসায় থাকি। আমার তিনটা মেয়ে আছে; আমি যে আমার সংসার জীবনটা কীভাবে চালাচ্ছি কেউ জানেনা! এমন পরিস্থিতিতে হয় আমার জীবন দিয়ে দিতে হবে, অথবা কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।’

অপর এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার অনেক সম্পত্তি ছিল—সেসব ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার ভাইয়েরা আমাকে ত্যাগ করেছে। আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই নেশা মানুষকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দেয়। এই নেশা অনেক কিছু কেড়ে নেয়—টাকাপয়সা থেকে শুরু করে আপনজন পর্যন্ত ছেড়ে চলে যায়।’

এছাড়াও, জুয়ায় ৮০-৯০ লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করা ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি প্রশ্ন তুলেছেন—‘প্রশাসনের চেয়েও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণকারীরা কি বেশি শক্তিশালী? সরকারের চাইতেও তারা শক্তিশালী?’

এবিষয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে অনুসন্ধানের কথা জানালেও মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে সচেতনতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান আসলে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এই দিকটাও আমাদের একটু দেখতে হবে। আমরা যদি সকলে মিলে সচেতন হই, তাহলেই শুধুমাত্র এই অনলাইন জুয়া থেকে আমরা আমাদের যুবসমাজকে রক্ষা করতে পারব।’

অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো প্রতিরোধ কমিটির রংপুরের প্রধান সমন্বয়ক সাদ্দাম হোসেন এক্ষেত্রে মাদকের চেয়েও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ মাদকাসক্ত হলে ৫ হাজার টাকা নষ্ট করে, কিন্তু এই জুয়ায় আসক্ত হয়ে মানুষ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত নষ্ট করে। এতে বাড়ি-গাড়ি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেকের সংসার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’

উল্লেখ্য, গত ১২ এপ্রিল রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে এই কমিটির উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে এই সংগঠনের নেতাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া ও বেটিং সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের আওতায় জুয়া খেলা বা সাইট পরিচালনা করার শাস্তি হচ্ছে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা।

এ প্রসঙ্গে আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘কেউ আইনের আওতায় গ্রেফতার হলেও জামিন পেয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে করি—এটি যেহেতু জামিন অযোগ্য অপরাধ, কাজেই জামিনের ক্ষেত্রে যেমন কঠোরতা দরকার; পাশাপাশি এর শাস্তির পরিমাণটাও বাড়ানো উচিৎ।’

অপরাধ বিশ্লেষক মাহমুদুল হক বলেন, ‘এই ধরণের কর্মকাণ্ড (জুয়া) থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। তবে জুয়ায় আসক্তদের জন্য মনোচিকিৎসা, কাউন্সিলিং, অনলাইন লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক নজরদারি কার্যকর হতে পারে।’

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, এসব জুয়ার সাইটের বেশিরভাগ বিদেশ থেকে পরিচালিত হলেও স্থানীয়ভাবে এদের এজেন্ট রয়েছে, বিশেষ করে রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে।

সচেতন মহলের দাবি, জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও তাদেরকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনলে এ ধরনের অপরাধ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

সারাবাংলা/এআর
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর