রংপুর: প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ কিংবা অবকাঠামো—কোথাও অগ্রাধিকার পায়নি উত্তরের জনপদ রংপুর। বন্ধ চিনিকল ও পরিত্যক্ত বিমানবন্দর পুনরুদ্ধার, তিস্তা প্রকল্প, এমনকি নামমাত্র বরাদ্দের তালিকাতেও জায়গা হয়নি রংপুর সিটি করপোরেশনের। দক্ষিণে একের পর এক বড় প্রকল্পের ঘোষণার বিপরীতে বারবার উপেক্ষিত রংপুরবাসী এখন ক্ষোভে ফুঁসছে।
জাতীয় বাজেটে প্রতি বছরই ‘উপেক্ষিত’ তকমা গায়ে মেখে আসা রংপুর এবারও পেল না প্রত্যাশিত স্থান। প্রস্তাবিত উন্নয়ন বরাদ্দে রংপুর সিটি করপোরেশনের নামই নেই উল্লেখযোগ্যভাবে। বন্ধ হয়ে পড়া শ্যামপুর চিনিকল কিংবা পরিত্যক্ত ছয় বিমানবন্দর চালুর কোনো উদ্যোগ না থাকায় স্বস্তির বদলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে জনপদটিতে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে উন্নয়ন প্রকল্পের অধিকাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে বাজেটে রংপুর কতটুকু পেল ও কতটুকু পায়নি।
কৃষি ও শিল্পে অবহেলা
উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব গড়ে তুলতে ৩০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বললেও এ তহবিলে রংপুরের নাম সুস্পষ্ট নয়। জিআই স্বীকৃত ‘হাড়িভাঙ্গা আম’ সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগারের দাবি উপেক্ষা করে বাজেটে অগ্রাধিকার পেয়েছে অন্য অঞ্চল। কৃষি অর্থনীতি গবেষক রায়ান আহমেদ রাজু সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে প্রতিবছর সংরক্ষণের অভাবে প্রচুর কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। আমরা ব্যাপকভাবে এই বাজেটে হতাশ হয়েছি।’
বছরের পর বছর ধরে বন্ধ থাকা রংপুরের শ্যামপুর চিনিকল চালুতে বাজেটে কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে বন্ধ এ শিল্প কারখানায় ব্যয় হচ্ছে মাসিক প্রায় ২৪ লাখ টাকা। শুধু চিনিকলই নয়, বহুল আলোচিত উত্তরাঞ্চলের ছয়টি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর সচলের প্রতিশ্রুতিও বাজেটের কাগজে স্থান পায়নি। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে চুক্তির কথা বললেও বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
যোগাযোগ অবকাঠামোতে বৈষম্য
ঢাকা-রংপুর ব্রডগেজ রেলপথ, রংপুর-বুড়িমারী ছয় লেন সড়ক, চিলমারী ও বালাসী ঘাট নদীবন্দর আধুনিকায়নের মতো দীর্ঘদিনের দাবিও উপেক্ষিত এবারের বাজেটে। বিপরীতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে একাধিক বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ১৫৩টি নতুন প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ৪২ শতাংশ (প্রায় ৮৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা) দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগকে। অথচ কৃষিপ্রধান ও দরিদ্র রংপুর বিভাগ পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ (৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরী মনে করেন, ‘এটা কখনো আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, কখনও আমলাতান্ত্রিক কূটকৌশল। যেভাবেই হোক, রংপুর অঞ্চলকে পিছিয়ে রাখার ব্যবস্থাপনা এই বাজেটেও জারি আছে।’
তিস্তা ও অন্যান্য উদ্যোগ
দুই কোটি মানুষের অভিশাপ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ নেই। তিস্তার ভাঙন রোধ, পলি ব্যবস্থাপনা ও নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এই প্রকল্পকে জরুরি বলে মনে করলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি প্রকট। তামাক চাষে প্রলোভন দেখিয়ে কৃষকদের প্রতারিত করার ঘটনাও রংপুরের কৃষি অর্থনীতির জন্য হুমকি স্বরূপ।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী দীর্ঘদিনের এই বাজেট বৈষম্যের কথা স্বীকার করে বলেছেন, ‘এই বৈষম্যের কারণে আমরা দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি।’
সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের বণ্টনে রংপুর যেন এক সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাহামুদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের রংপুর অঞ্চলের মানুষ অধিকার চায়। অন্যথায় আমরা বাধ্য হব রাস্তায় নামতে।’
গবেষক রাতু রুমানা চৌধুরী স্নেহার কথায়, ‘কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, শিক্ষা—সব কিছুতেই পিছিয়ে থাকা রংপুরের মানুষের ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে।’
বারবার প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশা ভেঙে যাওয়া রংপুরবাসী এবার শুধু প্রশ্ন তুলেছে— উন্নয়নের মহাসড়কে রংপুরের যাত্রা শুরু হবে কবে?