Wednesday 02 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

পদ্মার মিডল চর / ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’র সৌন্দর্যের আড়ালে মানবেতর জীবন

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১৯

‘মিনি সুইজারল্যান্ড’খ্যাত পদ্মার মিডল চরের অপার সৌন্দর্য। ছবি: সারাবাংলা

রাজশাহী: দিগন্ত-বিস্তৃত রঙিন নীল-সাদা আকাশ। চারিদিকে চোখ ধাঁধানো সবুজের সমারোহ। যতদূর দৃষ্টি যায় থৈ-থৈ পানি আর বাতাসের গর্জন। পাখপাখালি, গরু-মহিষের পদচারণায় মুখরিত পদ্মার বুকে ভেসে ওঠা ১৫ মাইলের ছোট্ট একটি চর। নাম তার মিডল চর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে অনেকে তাকে ডাকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে। স্বর্গীয় আভা এই চরকে জড়িয়ে রাখলেও খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ নাগরিক সেবাহীন দুর্বিষহ জীবন চরের বাসিন্দাদের। তাই জীবন-মান উন্নয়নে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন চরবাসী।

রাজশাহীর পবা উপজেলাধীন হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এই চরটি চরখিদিরপুরের অংশ। যা চরখিদিরপুর ও চরখানপুরের লাগোয়া চরাঞ্চল। এই চরটি প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এবং প্রায় চার কিলোমিটার প্রস্থে বিস্তৃত। এখানে প্রায় ১৪০-১৫০টি বসতি রয়েছে, যেখানে সাত শতাধিক মানুষের বসবাস। এ ছাড়া চার হাজারেরও বেশি গরু, পাঁচ শতাধিক মহিশ ও অসংখ্য ছাগল ও ভেড়ার পদচারণায় মুখরিত এই চর। এখানে ধান, পাট, গম, কালাইসহ চাষ হয় নানা কৃষিজ সামগ্রী। কিন্তু সৌন্দর্যের পাশাপাশি সংকটও প্রবল এই ছোট্ট চরে। চরবাসীর নানাবিধ সমস্যা উঠে এসেছে সারাবাংলার অনুসন্ধানে।

বিজ্ঞাপন

নেই চিকিৎসা ব্যবস্থা

সৌন্দর্যের আধার এই চরের অধীবাসীদের চিকিৎসা সেবা চরমভাবে অবহেলিত। এখানে নেই কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থা। ফলে জরুরি রোগী বা সাপে কাটা মানুষকে নদী পার করে শহরে নেওয়ার পথেই অনেকের মৃত্যু হয়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও আশঙ্কাজনক রোগীদের ক্ষেত্রে রাতে বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যাতায়াত ও সময়ক্ষেপণ প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও যাতায়াত সুবিধার অভাবে চরাঞ্চলের মানুষকে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে চরম মৃত্যুঝুঁকি ও মানবেতর অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

দাফন-কাফনের ব্যবস্থা নেই

চরের নিচু ও পলিমাটি সমৃদ্ধ জমিতে মৃতদেহ দাফনের কোনো সুব্যবস্থা নেই। ফলে কারও মৃত্যু হলে স্বজন হারানোর বেদনার চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় যে, মৃতদেহের শেষকৃত্য কোথায় হবে। চরে ব্যবস্থা না থাকায় মৃতদেহ দাফন করার জন্য নৌকায় করে নদীর ওপারে নিয়ে যেতে হয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বাসিন্দাদের তথ্য মতে, দাফনের জন্য তারা সাধারণত নদীর ওপারে খোজাপুর এবং দাসমারি এলাকার কবরস্থান ব্যবহার করেন। চরের বাসিন্দারা এই পরিস্থিতিকে তাদের জীবনের অন্যতম বড় একটি ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ, মৃত্যুর পরও তাদের প্রিয়জনদের নিজ ভূমিতে দাফন করার কোনো সুযোগ থাকে না।

নেই কোনো মুদি দোকান বা কাঁচাবাজার

মিডল চরে কোনো কাঁচাবাজার বা মুদি দোকান না থাকায় দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য বাসিন্দাদের নদী পার হয়ে ওপারে ‘সাহেব বাজার’ বা ‘কাটাখালি’ এলাকায় যেতে হয়। খারাপ আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকলে বাজারে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে চরের মানুষকে অনেক সময় খাদ্য সংকটে পড়তে হয়।

বন্যায় মানবেতর জীবনযাপন

বাংলা ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে চরে বন্যা দেখা দেয়, যা প্রায় দেড় থেকে দুই মাস স্থায়ী হয়। এ সময় পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে গৃহহীন হয়ে পড়া বাসিন্দাদের সহায়-সম্বল ও গবাদিপশু নিয়ে দূরের উঁচু স্থান বা মেইনল্যান্ডে আশ্রয় নিতে হয়। গবাদিপশু স্থানান্তরের সময় দুর্ঘটনা ঘটে এবং সাপের উপদ্রব বাড়ায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসার অভাবে জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়ে। এ ছাড়া বন্যার পানিতে ধান, পাট ও কালাইসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় চরের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে।

অপ্রতুল শিক্ষা ব্যবস্থা

চরের শিক্ষা ব্যবস্থা একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে উচ্চ বিদ্যালয় বা কোনো মাদরাসা নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৪০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে পাঁচ জন শিক্ষক। যাতায়াত সমস্যার কারণে ওপার থেকে আসা এসব শিক্ষকরা নিয়মিত বা পর্যাপ্ত সময় পাঠদান করতে পারেন না। অন্যদিকে প্রাথমিকে পড়া শেষ হলেও চরে হাই স্কুল না থাকা এবং নদী পার হয়ে শহরে গিয়ে পড়ার খরচ বহন করতে না পেরে অধিকাংশ শিশুর শিক্ষাজীবন থেকে যায়। এ ছাড়া দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নদী পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেক সময় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

‘মিনি সুইজারল্যান্ড’খ্যাত পদ্মার মিডল চরের অপার সৌন্দর্য। ছবি: সারাবাংলা

‘মিনি সুইজারল্যান্ড’খ্যাত পদ্মার মিডল চরের অপার সৌন্দর্য। ছবি: সারাবাংলা

সোলার প্যানেলই বিদ্যুতের ভরসা

চরে জাতীয় গ্রিডের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, ফলে একমাত্র ভরসা সৌরবিদ্যুৎ (সোলার প্যানেল)। তবে এই সোলার প্যানেল সবাই পায় না। আবার অনেকের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে থাকায় বা মেঘলা দিনে আলো না পাওয়ায় অন্ধকারে থাকতে হয়। সোলার দিয়ে শুধু আলো জ্বালানো বা মোবাইল চার্জ দেওয়ার মতো সামান্য কাজ হলেও চরম গরমে বা রাতে সাপের আতঙ্কে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।

চরটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দারুণ নিদর্শন উল্লেখ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ সিদ্দিকী সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিডল চর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে শোভিত দারুণ একটি জায়গা। এখানে আকাশের সঙ্গে যেন সবুজ জমিন মিশে গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। দারুণ সময় উপভোগ করেছি। তবে চরের যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এ নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। না হলে বিপদ ঘটতে পারে।’ চরবাসী নাগরিক সেবাবিহীন জীবনযাপন করে উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, ‘নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত এই চরটি। সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো।’

চরে জীবন-যাপন সম্পর্কে জানতে চাইলে চরবাসী কৃষক আমিরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাজার-ঘাটের চরম অভাব আমাদের চরে। পুরো চর জুড়ে কোনো মুদি দোকান বা কাঁচাবাজার নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হলে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে ওপারে যেতে হয়, যাতে যাতায়াতেই পুরো একদিন সময় লেগে যায়। নদীর ঢেউ বাড়লে বা আবহাওয়া খারাপ থাকলে বাজারে যাওয়াও সম্ভব হয় না।’

মিডল চরের এক রাখালের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিনিধির। তিনি বলেন, ‘এখানে কেবল একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, কোনো উচ্চবিদ্যালয় নেই। শিক্ষকরা নদী পার হয়ে ওপার থেকে আসে। মাঝে-মধ্যে যাতায়াত সমস্যার কারণে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। এ ছাড়া চরে কোনো জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ নেই। কিছু সরকারি সোলার প্যানেল দেওয়া হলেও সেগুলোর ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ও চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মানুষকে প্রায়ই অন্ধকারে রাত কাটাতে হয়।’

বন্যার সময় আশ্রয়হীন জীবন চরম কষ্ট কাটে জানিয়ে চরের বাসিন্দা মো. শাহজাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিবছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে বন্যা হলে ঘরবাড়ি ডুবে যায়। তখন চরের মানুষদের সহায়-সম্বল নিয়ে অন্যের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। বন্যার সময় বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আমাদের চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া চরের প্রায় প্রতিটি ঘরে প্রচুর গরু-ছাগল থাকলেও বন্যার সময় সেগুলো রাখার মতো কোনো উঁচু জায়গা বা আশ্রয়কেন্দ্র নেই। নৌকা দিয়ে পারাপার করতে গিয়ে অনেক সময় পশুর পা ভাঙ্গে। আবার কখনো মারাও যায়।’

‘মিনি সুইজারল্যান্ড’খ্যাত পদ্মার মিডল চরের অপার সৌন্দর্য। ছবি: সারাবাংলা

‘মিনি সুইজারল্যান্ড’খ্যাত পদ্মার মিডল চরের অপার সৌন্দর্য। ছবি: সারাবাংলা

জায়গা ও জমিসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে কথা হয় চরের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে। তারা বলেন, বাসিন্দাদের বাপ-দাদার আমলের জমি থাকলেও দীর্ঘ ৪০-৫০ বছর ধরে সেগুলোর খাজনা বা খারিজ (নামজারি) করার কোনো ব্যবস্থা নেই। জমির সঠিক সরকারি রেকর্ড না থাকায় তারা সবসময় ভয়ে থাকেন যে, ভবিষ্যতে প্রভাবশালীরা তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে পারে।

দীর্ঘ সাত বছর ধরে পরিবারের ১১ জন সদস্যকে নিয়ে চরে বসবাস করেন সীমা বেগম। চরের মানবেতর জীবনের করুণ চিত্র তুলে ধরে সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘চরে কোনো হাসপাতাল বা কবরস্থান নেই। কেউ মারা গেলেও মরদেহ দাফন করতে ওপারে নিয়ে যেতে হয়। বাজার বলতে কিছু নেই, সামান্য কেনাকাটার জন্য শহিদ বাজারে যেতে হয়। বছরে ধান, পাট, গম বা কালাইয়ের মাত্র একটা ফসল পাই, তাও অনেক সময় বন্যায় ভেসে যায়।’

সার্বিক বিষয়ে স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিডিল চরে মোটামুটি ১৪০ থেকে ১৫০ বসতি রয়েছে। যেখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪০০ এবং শিশুসহ সর্বমোট জনসংখ্যা ৭০০ জনের মতো। চরে মানুষের প্রধান ভরসা পশুপালন; পুরো অঞ্চলে ৭-৮ হাজার গবাদিপশু থাকলেও শুধুমাত্র এই মিডিল চরের ভেতরেই রয়েছে প্রায় ৪ হাজার গরু।’ চরবাসীর জীবন মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধি।

আর চরে একটি হাসপাতাল, হাইস্কুল, ওপেন সোলার প্যানেল এবং বন্যার সময় গবাদিপশুসহ আশ্রয়ের জন্য একটি উঁচু কেল্লা বা সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি স্থানীয়দের।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর