রাজশাহী: মোহনপুর উপজেলায় একটি প্রকল্পে অনিয়ম এবং দু’টি প্রকল্পে কাজ না করেই বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, এই প্রকল্পগুলো স্থানীয় সংসদ সদস্য বরাদ্দ দিয়ে থাকেন, যা বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। তাই এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় এমপি বলছেন, কাজ না করার সুযোগ নেই।
অনুসন্ধান দেখা যায়, উপজেলার জাহানাবাদ ইউনিয়নের জাহানাবাদ স্কুলসংলগ্ন (বাবুলের বাড়ি থেকে শাহানাদের বাড়ি পর্যন্ত) ৫০০ ফুট রাস্তা (ইট সোলিং) করার কথা থাকলেও ৩৬২ ফুট রাস্তার কাজ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাস্তা ৮ ফুট চওড়া করার কথা থাকলেও করেছেন ৭ ফুট। এ ছাড়াও রয়েছে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ। কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পের এ কাজটি সম্পন্ন না করেই সম্পূর্ণ বরাদ্দ তুলে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পটির সভাপতি ছিলেন আব্দুস সামাদ মেম্বার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি মূলত ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন ভাইয়ের হাত দিয়ে এসেছে। ওয়ার্ড মেম্বার হওয়ায় আমি নামে সভাপতি ছিলাম। তবে ৫০০ ফুট রাস্তা করার কথা থাকলেও ৩৬২ ফুট করা হয়েছে। কারণ, পরের অংশটুকু রাস্তায় মাটি ফেলে রেডি করে এর পর করতে হতো। এর জন্য আর করা হয়নি। তাছাড়া রাস্তা চওড়া ছিল ৭ ফুট তাই ৮ ফুট করারও সুযোগ ছিল না।’
এদিকে অনুসন্ধানে মিলেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য, কাজের বিনিময়ে খাবার (কাবিখা) এর দুটি প্রকল্পে কাজ না করেই সম্পূর্ণ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ও প্রকল্প সভাপতি কামালের বিরুদ্ধে। প্রকল্প দু’টি হলো- চক বিরহী সরদার পাড়া মসজিদ থেকে আফজালের বাড়ি পর্যন্ত (ইট সোলিং) এবং চক বিরহী সোলাইমানের বাড়ি থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত (ইট সোলিং)।
বিল তুলে নেওয়ার সত্যতা স্বীকার করে অভিযুক্ত প্রকল্প সভাপতি কামাল মেম্বার সারাবাংলাকে বলেন, ‘জুন মাস চলে গেছে, বিল তো তুলে নেবেই। আমার কাছ থেকে উপজেলা অফিস সিই নিয়েছে। কতটুকু কাজ হবে, না হবে তারা বলতে পারবে।’
কাজ না করে বিল কেন তুলে নেওয়া হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির জন্য কাজ করা সম্ভব হয়নি। সব সামগ্রী প্রস্তুত আছে, কাল থেকে কাজ শুরু হবে। আপনি এসব নিয়ে ঝামেলা কইরেন না।’ কাজ শুরু না করেই সম্পুর্ণ বিল তুলে নেওয়ার নিয়ম আছে কি-না? এমন প্রশ্নের উত্তর দেননি তিনি।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তায় এক গাড়ি ইট রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এলাকার এমপি আসার খবর শুনে কয়েকদিন আগে মাত্র এক গাড়ি ইট এনে পথে রেখেছেন তিনি। আর কোনো নির্মাণসামগ্রী আনা হয়নি।
কাগজে কলমে এই প্রকল্পগুলোর সভাপতি আব্দুস সামাদ মেম্বার এবং কামাল মেম্বার থাকলেও কলকাঠি নাড়ার অভিযোগ রয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের তাজ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। প্রকল্প সভাপতি ও উপজেলা প্রকল্প অফিসারকে ম্যানেজ করে এসব কাজে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় তাজ উদ্দিন আহমেদের সাথে। অভিযোগ অস্বীকার করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে তিনি বলেন, ‘রাস্তা কত ফিট হবে সেটা নির্ধারিত ছিল না। যতটুকু করা সম্ভব হয়েছে করেছি। রাস্তার আশেপাশে বাড়ি ও স্কুল ছিল। ফলে রাস্তা ৮ ফুট চওড়া করা যায়নি। তবে রাস্তায় এক নম্বর ইট ব্যবহার করা হয়েছে।’
কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে, তাই কাজ শুরু হয়নি। তবে টাকা তুলে নিয়েছে, নাকি নেয়নি, তা আমি জানি না। প্রকল্প সভাপতি আছে সে বলতে পারবে।’ কাজ না করে প্রকল্পের টাকা তুলে নেয়ার সুযোগ আছে কি-না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘এগুলো অফিসিয়াল বিষয়, আমি জানি না।’
এ কাজগুলো তার তত্ত্বাবধান করছেন কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এগুলো উপজেলার নেতারা ও প্রকল্প সভাপতিরা দেখাশোনা করছেন, তিনি জানেন না। তবে জাহানাবাদ স্কুলসংলগ্ন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই কাজগুলোর সভাপতি স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার এবং তার মাধ্যমেই বিল উত্তোলন হয়। কিন্তু এখানে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন আহমেদ প্রভাব খাটিয়ে মেম্বারকে নামেমাত্র রেখেছেন। এ ছাড়া তিনি উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কাজগুলো হাতিয়ে নিয়ে ইচ্ছেমতো লুটপাট করছেন।’
জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কাজ না করে টাকা তুলে আত্মসাৎ করা, কাজে ফাঁকি দিয়ে টাকা মেরে দেওয়ার ঘটনায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নেতাকর্মীদের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছেন তারা। এমন চলতে থাকলে সামনে স্থানীয় নির্বানে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।’
স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘কামাল মেম্বারের মাধ্যমে এলাকার দুটো রাস্তা হওয়ার কথা, কোনো কাজ হয়নি এখনো। একটা রাস্তায় এক গাড়ি ইট রাখা আছে। মনে হয় না সে কাজ করবে। কাজ করলে তো মালামাল আনতো। অন্যদিকে শুনতেছি, টাকা তুলে নিয়েছে। কাজ না করে টাকা হাতে পাওয়ার পর মনে হয় না আর কাজ করবে! এ কাজে প্রকল্প কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা রয়েছে।’
জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামিমুল ইসলাম মুন এ বিষয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই প্রকল্পগুলো এমপি সাহেবের বরাদ্দে হচ্ছে, যা ওয়ার্ড সভাপতি ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মাধ্যমে হবে। এখানে ইউনিয়ন বা উপজেলার নেতাদের সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নেই। আমাদের কোনো নেতা জড়িত কি-না আমি খোঁজ নেব।’
কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়া গুরুতর অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটা গুরুতর অপরাধ। আমি এ বিষয়ে খোঁজ নেব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
অভিযুক্ত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. তারিকুল ইসলামের মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে কথা হয় রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শফিকুল হক মিলনের সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। এখন শুনলাম। বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেব। তবে আমার নির্বাচনি আসনে টাকা নিয়ে কাজ না করার সুযোগ নেই। অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’