ঢাকা: অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার লকার থেকে প্রায় তিন কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কার খোয়া যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সই জাল ও ভুয়া ঘোষণাপত্র তৈরির মাধ্যমে লকার থেকে স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন প্রবাসী এক নারী। সেই সঙ্গে দু’টি চেক জালিয়াতি করে টাকা তুলে নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কমন সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে জমা দেওয়া লিখিত এক অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফারজানা রহমান লিমা ও তার স্বামী ২০১৯ সালের ১৫ জুন কানাডায় পাড়ি জমান। বিদেশ যাওয়ার সময় অগ্রণী ব্যাংক রমনা করপোরেট শাখায় মায়ের লকারে (৪০৯ নম্বর) নিজের স্বর্ণালংকার জমা রাখেন। সেখানে তার মায়ের স্বর্ণালংকারও ছিল। ওই লকারে রাখা ফারজানার স্বর্ণালংকারের বর্তমানে আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর তার মায়ের গচ্ছিত স্বর্ণালংকারের আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দু’জনের স্বর্ণালংকারের মোট আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ফারজানা পরে জানতে পারেন লকারটির পরিচালনার জন্য মা তার নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু তার মা হোস্নে জাহান ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মারা যান। তখন ফারজানা দেশে আসতে পারেননি। ২০১৯ সালের জুনে বিদেশ যাওয়ার পর তিনি প্রথম দেশে ফেরেন ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট। দেশে ফিরে জানতে পারেন, মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি অবহিত করে তার বোন ফারহানা রহমান অগ্রণী ব্যাংকের ওই লকার পরিচালনার আবেদন করেন। এর পর তার সই জাল করে একটি ‘মিথ্যা ঘোষণাপত্র’ তৈরি করে ব্যাংকে জমা দেন ফারহানা। ঘোষণাপত্রটি ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংকে দাখিল করা হয়।
ফারজানা জানান, ব্যাংক তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই জাল সই ও মিথ্যা ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ফারহানাকে লকার খুলতে দেয়। এর পর ওই ভুয়া ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে তার ও মায়ের গচ্ছিত সব স্বর্ণালংকার কোনো বৈধ উত্তরাধিকারসংক্রান্ত প্রক্রিয়া ছাড়াই লকার থেকে বের করে নেওয়া হয়। দেশে এসে তিনি চলতি বছরের ২৪ আগস্ট ব্যাংকে গিয়ে খোঁজ নেন। তখন তিনি জানতে পারেন, তার মায়ের লকারের স্বর্ণালংকার ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বের করে নেওয়ার পর লকারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ফারজানার অভিযোগ, তার ও মায়ের স্বর্ণালংকার মালিকের অনুপস্থিতিতে এবং অনুমতি ছাড়া কীভাবে বের করে নেওয়া হলো? এ বিষয়ে তিনি ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে জানতে চান। এ জন্য অগ্রণী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে কিছু কাগজপত্রের অনুলিপিও সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ফারহানা রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘বোনের সই করা নথির প্রিন্ট কপি আমার কাছে আছে।’ তবে নথিটির মূল কপি কীভাবে তার হাতে এসেছে, সেটি তিনি নিজেও জানেন না। ফারহানা বলেন, ‘ওই কাগজ আমার বোনই পাঠিয়েছিলেন।’ লকার থেকে বোন ও মায়ের স্বর্ণালংকার বের নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন সুমি। তিনি বলেন, ‘বোনের গয়নার একটি বাক্স আমার কাছে রয়েছে। এবং সেগুলো অন্য একটি ব্যাংকের লকারে রাখা আছে, যা আমি এখনো খুলে দেখিনি।’
অভিযোগে শুধু লকারের স্বর্ণালংকার নিয়ে নয়, তার সই করা দু’টি চেক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ফারজানা রহমান লিমা। তার দাবি, বিদেশ যাওয়ার আগে মায়ের দৈনন্দিন বা জরুরি খরচ মেটানোর জন্য দু’টি চেক সই করে রেখে যান। কিন্তু ওই চেক বইয়ের দু’টি পাতা ব্যবহার করে চলতি বছরের ২৭ জুলাই ও ৩ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের পৃথক দু’টি শাখা থেকে তার বোন ফারহানার প্রতিনিধি (ফাহমিদা ও সামিয়া) টাকা উত্তোলন করেন (একটি চেকে ৩০ হাজার, অপর চেক দিয়ে ৩৮ হাজার ৫০০টাকা)।
এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহানা রহমান সুমি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ‘১০০ শতাংশ মিথ্যা’ বলে দাবি করেন। তার দাবি, বিদেশে যাওয়ার আগে বোন দেশে থাকা সম্পদ বা লকারের বিষয়ে কিছুই তাকে বুঝিয়ে দিয়ে যাননি। এমনকি তাদের মা মারা যাওয়ার আগেও লকারে থাকা সম্পদ সম্পর্কে তাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে যাননি। আর বোনের চেক নিয়ে তিনি জালিয়াতি করেছেন—এমন অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই।
তবে ফারজানা রহমানের প্রশ্ন, তিনি বিদেশে থাকা অবস্থায় তার স্বর্ণালংকার লকার থেকে কীভাবে বের করা হলো এবং তার অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও ব্যাংকিং কার্যক্রম কীভাবে সম্পন্ন করা হলো? বিশেষ করে লকার পরিচালনা, স্বর্ণালংকার উত্তোলন এবং এ-সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তার।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, “অভিযোগটি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি ‘ইনকোয়ারি’ বা ‘অডিট টিম’ গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত না করে এর সত্য-মিথ্যা কোনোটিই বলা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, ‘তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মেলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে চাই না। যাচাই-বাছাই শেষে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’
আর এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘অভিযোগ এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে। পাশাপাশি আমরা অগ্রণী ব্যাংকের কাছে জবাব চাইব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’