Wednesday 19 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুনে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমান‌তে ধস

আদিল খান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৯ আগস্ট ২০২৬ ১১:০৮

ঢাকা: দেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতে আবারও আস্থার সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক মাসের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসা প্রবাসী আয় কমেছে প্রায় ২১ কোটি মার্কিন ডলার। তবে আমানত ও প্রবাসী আয়ে বড় ধাক্কার বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্র‌তি‌বেদ‌নে এ তথ্য উ‌ঠে এ‌সে‌ছে। ইসলামি ব্যাংকিং খাতের আকার বাড়লেও সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে এর বাজার অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে চাপ রয়েছে। বিশেষ করে আমানত ও প্রবাসী আয় আহরণে সাম্প্রতিক দুর্বলতা খাতটির জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদ‌নে জুন শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা। মে মাসে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে আমানত কমেছে প্রায় ১২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, বা ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

দেশের পুরো ব্যাংক খাতে জুন শেষে মোট আমানত ছিল ২২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশ ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বিপরীতে প্রচলিত ব্যাংকের অংশ ৭৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি‌বেদ‌নে ইসলামি ব্যাংকিং খাতে আমানতের ওঠানামার পেছনে আস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর ইসলামি ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এতে কিছু আমানতকারী প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছিলেন।

এর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ইসলামি ব্যাংকগুলোতে তদারকি বাড়ানো, তারল্য সহায়তা দেওয়া, ব্যাংকের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে আমানতকারীদের আস্থা ফিরতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপও আমানতকারীদের আচরণে প্রভাব ফেলেছে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব নেয়। একই সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু আমানত হিসাব পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়।

জুনে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মে মাসে এসেছিল ৬৫৭ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এক মাসে কমেছে ২০৯ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২১ কোটি ডলার। শতকরা হিসাবে এই পতন ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ।

শুধু মাসিক হিসাবেই নয়, এক বছরের তুলনাতেও ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় কমেছে। জুন ২০২৫-এ এসব ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬১২ মিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা কমে ৪৪৮ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ বছরভিত্তিক পতন ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

এটি ইসলামি ব্যাংকিং খাতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী আয় আহরণে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। জুনের প্রথম ১৩ দিনেই প্রবাসী আয় আহরণে ইসলামী ব্যাংক দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায়, আর শীর্ষে উঠে আসে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

তবে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় কমলেও দেশের সামগ্রিক প্রবাসী আয় কমেনি। বরং জুনে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৮১৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৩৭১ বিলিয়ন ডলার। ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৪৪৮ মিলিয়ন ডলার। ফলে মোট রেমিট্যান্সের বাজারে প্রচলিত ব্যাংকের অংশ আরও বেড়েছে।

অর্থাৎ এখানে মূল সমস্যা দেশের প্রবাসী আয় কমে যাওয়া নয়; বরং ইসলামি ব্যাংকগুলো তাদের আগের বাজার অংশ ধরে রাখতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ইসলামি ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক ধাক্কা সাময়িক। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষত সাময়িকের জন্য। ইতিমধ্যেই তা শুকিয়ে গেছে।’

তিনি জানান, ‘ইসলামী গ্রাহক ফোরাম’-এর আন্দোলনের সময় ইসলামি ব্যাংকগুলোতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং তখন বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিয়েছিল।

রেমিট্যান্সে ইসলামী ব্যাংকের প্রথম স্থান হারানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সাময়িক। এ মাসে ইসলামী ব্যাংক আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তারা আবার প্রথম স্থান দখল করেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, প্রবাসী আয় গ্রহণে ইসলামী ব্যাংকের বাজার অংশ কমে যাওয়ার বিষয়টি খাতটির অস্থিতিশীলতার একটি ইঙ্গিত। কারণ প্রবাসী আয় একটি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তি শক্তিশালী করে এবং বৈদেশিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে সহায়তা করে। তাই এই বাজার হারানো দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।

আমানত কমলেও ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়েছে। জুনে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। মে মাসে ছিল প্রায় ৫ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এক মাসে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৩ কো‌টি টাকা।

অর্থাৎ আমানত কমলেও বিনিয়োগের প্রবাহ পুরোপুরি থেমে যায়নি। এর অর্থ, ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান তহবিল ব্যবহার করে বিনিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রবাসী আয় কমলেও ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি আয় গ্রহণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুনে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি আয় এসেছে প্রায় ৭৪৩ মিলিয়ন ডলার। মে মাসে ছিল ৫৭৫ মিলিয়ন ডলার। এক মাসে বেড়েছে প্রায় ২৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। জুনে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আমানত ছিল প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। মে মাসে ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাসে কমেছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

আরো

আদিল খান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর