ঢাকা: মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। আর এর সঙ্গে ব্যাংকটির মালিকখ্যাত কয়েকজন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তাসহ (সিএফও) ডজনখানেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিশেষ ছকে ও এমডি মতিউল হাসানের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি চক্র ব্যাংকের প্রোভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটায় অনিয়ম করেছে বলে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া আসবাবপত্র কেনাকাটা, অনুমোদনহীন বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এসবের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। যেখানে অভিযোগের সত্যতা বিবেচনায় ব্যাংকটির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। যদি তারা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পাঠানো নথিপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে পরিচালক পদে নিয়োগের পর থেকে পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল ব্যাংকের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম এবং সিএসআরের আওতায় কম্বল কেনার নামে ১১০ কোটি টাকা এবং ব্যবসা উন্নয়ন খাতের আওতায় ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার কেনার নামে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখসহ মোট ১৮৭ কোটি টাকা সংঘবদ্ধভাবে আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এটিকে আমলে নিয়ে তদন্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল।
অভিযোগের তথ্যানুযায়ী, সিএ, এসিসিএ এবং এফসিএ-এর মতো পেশাগত সনদ না থাকার পরও তাপস চন্দ্র পাল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও অফিসে দীর্ঘদিনের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি করেছেন। এ ক্ষেত্রে কিছু নিয়ন্ত্রক পরিদর্শকের নীরব সহযোগিতারও অভিযোগ রয়েছে। ফলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি, প্রোভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের জন্য বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ (প্রোভিশন) না রেখেই আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করেছেন। ফলে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরি ছেড়ে যাওয়া বহু কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজে দায়িত্ব পালনের সময় এসব সুবিধা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার অজুহাত দেখিয়ে বহু অবসরপ্রাপ্ত ও পদত্যাগী কর্মচারীকে বছরের পর বছর তাদের আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
নথি অনুযায়ী, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, বিশেষ সিএসআর এবং বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমের ডায়েরি, ক্যালেন্ডার, কম্বল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সফটওয়্যার, আসবাবপত্র ইত্যাদি) জন্য বরাদ্দ তহবিল প্রভাবশালী পরিচালক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, তাপস পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনয়ির অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এর পর পদোন্নতি নিয়ে তাকে আর ভাবতে হয়নি। তিনি ২০১৮ সালে ভিপি পদে, ২০২১ সালে এসভিপি, ২০২২ সালে ইভিপি এবং ২০২৪ সালে এসইভিপি হন। আর পরচিালকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পুরস্কার হিসাবে ২০২৬ সালে ডিএমডি হিসেবে পদোন্নতি পান তাপস চন্দ্র পাল।
অভিযোগ উঠেছে, পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভায় ভুয়া বিলের মাধ্যমে ব্যাংকটির এমডি মতিউল হাসান অবৈধ সুবিধা ভোগের উদ্দেশ্যে কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুহিনের সহযোগিতায় প্রতি বোর্ড ও ইসি সভায় নির্ধারিত ফি আট হাজার টাকার স্থলে দিতেন এক লাখ টাকা। যার সাসপেন্ড হিসাব এ/সি বিডিটি ১৪০৩৯০০০১০০০১। এরকম ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সমন্বয় গুরুতর আর্থিক জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধ। আর ব্যাংকটিতে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিএসআর তহবিলের আওতায় প্রায় ১১০ কোটি টাকার কম্বল ক্রয় দেখিয়ে কমপক্ষে ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন চেয়ারম্যানসহ সাত পরিচালক।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে এমডি মতিউল হাসান তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার মো. রেজা হোসেনের সহায়তায় স্বচ্ছ টেন্ডার ছাড়াই তিন কোটি ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেন। এর বিরোধিতার দায়ে ডিএমডি আদিল রাইহানকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর আইটি প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দুর্নীতিতে সহযোগিতা করতে বাধ্য করা হয়।
একইভাবে গত ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ না করে কোনো সফটওয়্যার ল্যাবকে আট লাখ ৪০ হাজার টাকা কার্যাদেশের পর এমডি মতিউল হাসান তার সহচর ইঞ্জিনিয়ার রেজা হাসানের প্রতক্ষ্য সহায়তায় রেইনবো অ্যারের অনুকূলে ব্যাংকটির কারওয়ান বাজার শাখার মাধ্যমে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্র আশিম কুমার শাহ্ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি আপনাকে এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না। কারণ, আমার কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি যদি ব্যাংকে ঘটে থাকে, তাহলে কোন বিভাগ এটি দেখছে, তা আমাকে জানতে হবে। আমি কাল অফিসে গিয়ে বিষয়টি জেনে আপনাকে জানাব।’
অপরদিকে অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়ম প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে যদি অনিয়ম উদ্ঘাটিত হয় তাহলে ব্যাখ্যা চেয়ে নির্দেশনা পাঠায়। অনিয়মের ব্যাখ্যা দিতে এরই মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে বিধিসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই নিয়ম।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সুতরাং এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক বিধিসম্মতভাবে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ব্যাংকের কাছে যে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, সেই ব্যাখ্যার জবাব সন্তোষজনক না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’