Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মার্কিনিদের উদ্দেশে ইরানের প্রেসিডেন্টের খোলা চিঠি

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১১ | আপডেট: ২ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০০

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ফাইল ছবি।

মার্কিনিদের উদ্দেশে ইরানের প্রেসিডেন্টের খোলা চিঠি

মার্কিন জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। চিঠিতে তিনি ইরানকে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’ বুধবার (১ এপ্রিল) চিঠিটি প্রকাশ করেছে।

চিঠিতে পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তুলেছেন যে ওয়াশিংটন সত্যিই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এই নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নাকি কেবল ‘ইসরায়েলের প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করছে যার জন্য ‘শেষ মার্কিন সৈন্য পর্যন্ত’ লড়াই করতে তারা প্রস্তুত।

পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘আধুনিক ইতিহাসে ইরান কখনোই আগ্রাসন, সম্প্রসারণ, উপনিবেশবাদ বা আধিপত্য বিস্তারের পথ বেছে নেয়নি। ইরান কখনোই আগে কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি। তবে যারা ইরানকে আক্রমণ করেছে, তাদের অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিহত করেছে।’

বিজ্ঞাপন

তার মতে, ইরানকে আগ্রাসী হিসেবে তুলে ধরা ‘ঐতিহাসিক বাস্তবতার’ সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

‘প্রেস টিভি’তে প্রকাশিত এই চিঠিতে পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘ইরান তার নাম সত্তা আর পরিচয়ের দিক থেকে মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও ধারাবাহিক এক সভ্যতা।’

ইরানকে একটি ‘হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়িত করার পেছনে বহিরাগত স্বার্থ কাজ করছে বলে দাবি করেন পেজেশকিয়ান।

তিনি বলেন, ‘ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখানো ঐতিহাসিক বা দৃশ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ধরনের ধারণা মূলত ক্ষমতাধরদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খেয়ালখুশির ফসল। নিজেদের চাপ সৃষ্টিকে বৈধতা দেওয়া, সামরিক আধিপত্য বজায় রাখা, অস্ত্র শিল্প টিকিয়ে রাখা এবং কৌশলগত বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একটি ‘শত্রু’ তৈরির প্রয়োজন থেকেই এমনটা করা হচ্ছে।’

তিনি রাষ্ট্রপতি, সরকার ও তার নাগরিকদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা টানতে চেয়েছেন এবং বলেছেন, আমেরিকানদের প্রতি ইরানি জনগণের কোনো বিদ্বেষ নেই।

তিনি লিখেছেন, ‘আমেরিকা, ইউরোপ বা প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণসহ অন্যান্য জাতির প্রতি ইরানি জনগণের কোনো শত্রুতা নেই। তিনি এই পার্থক্যকে ‘ইরানি সংস্কৃতি ও সম্মিলিত চেতনার গভীরে প্রোথিত একটি নীতি—কোনো অস্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান নয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘এমন পরিবেশে, যদি কোনো হুমকি না থাকে, তবে তা তৈরি করা হয়।’

তিনি ইরানকে ঘিরে থাকা বিপুল মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকেই এই অঞ্চলের আসল হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং ইরানের সামরিক অবস্থানকে সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এই ঘাঁটিগুলো থেকেই চালানো সাম্প্রতিক মার্কিন আগ্রাসনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে এই ধরনের সামরিক উপস্থিতি আসলেই কতটা হুমকিস্বরূপ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই, এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনো দেশই তার আত্মরক্ষামূলক সক্ষমতা জোরদার করা থেকে বিরত থাকবে না।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরান যা করেছে-এবং করে চলেছে-তা বৈধ আত্মরক্ষা, এবং কোনোভাবেই যুদ্ধ বা আগ্রাসনের সূচনা নয়।’

চিঠিতে বর্তমান শত্রুতার কারণ হিসেবে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাকে তিনি ‘একটি অবৈধ মার্কিন হস্তক্ষেপ’ বলে তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি বলেছেন, যা ইরানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছিল, একনায়কতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল এবং মার্কিন নীতির প্রতি ইরানিদের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ বপন করেছিল।

তিনি বলেন, পরবর্তীকালে শাহের প্রতি মার্কিন সমর্থন, ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন, নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক ‘উস্কানিবিহীন সামরিক আগ্রাসনের’ কারণে এই অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক চাপ সত্ত্বেও, পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন যে ইরান ভেঙে পড়েনি বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে সাক্ষরতার হার তিনগুণ বেড়ে ৯০ শতাংশের বেশি হয়েছে এবং প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, সাধারণ ইরানিদের উপর মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের ‘ধ্বংসাত্মক ও অমানবিক প্রভাবকে’ খাটো করে দেখা উচিত নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, সাম্প্রতিক বোমা হামলা ও সামরিক পদক্ষেপগুলোর গভীর মানবিক মূল্য রয়েছে।

চিঠিতে পেজেশকিয়ান সরাসরি মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য এবং আমেরিকান জনগণের জন্য এর উপকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, ‘এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকান জনগণের ঠিক কোন স্বার্থটি প্রকৃতপক্ষে পূরণ হচ্ছে?’
নির্দোষ শিশুদের গণহত্যা, ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ কারখানা ধ্বংস করা, অথবা একটি দেশকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ দম্ভ করা-এসব কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করে?’

চিঠিটিতে মার্কিন নীতির ওপর ইসরায়েলের প্রভাবের ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘এটাও কি সত্যি নয় যে, আমেরিকা ইসরায়েলের প্রক্সি হিসেবে এই আগ্রাসনে প্রবেশ করেছে।’

চিঠিতে তিনি তার দেশের অবকাঠামোর ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে একটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে নিন্দা করেছেন।

এই চিঠিটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উস্কানিতে আগ্রাসন শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার এই অবৈধ হামলা চালানোর জন্য আঞ্চলিক ঘাঁটি এবং ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করছে, যার ফলে ২০০ জনেরও বেশি শিশুসহ ২০০০ জনেরও বেশি ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর